টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি: এয়ারলাইন্সের খরচ বেড়ে গেলেও বিমানের ভাড়া বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না!
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা
কামরুল ইসলাম ছিলেন আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের লিমিটেড-এর প্রাক্তন হেড অব কাস্টমার সার্ভিস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স-এর প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার মার্কেটিং সাপোর্ট এন্ড পাবলিক রিলেশন, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ(বিডি) লিমিটেড-এর প্রাক্তন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, মার্কেটিং সাপোর্ট এন্ড পাবলিক রিলেশন এবং প্রাক্তন ম্যানেজার, জিএমজি এয়ারলাইন্স লিমিটেড। যোগাযোগ, মার্কেটিং ও পাবলিক রিলেশন ক্যারিয়ারে দারুণ সফল এই মানুষটির সাক্ষাৎকার নিয়েছে ট্রাভেল বাংলাদেশ। কথা বলছেন কোভিড-১৯ এর ফলে লকডাউনের সময় দেশের এভিয়েশন শিল্পের সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ এর ফলে সমগ্র বিশ্বে লকডাউন। এসময় আপনার প্রতিষ্ঠান ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের অবস্থা সম্পর্কে বলুন-
কামরুল ইসলাম : কোভিড-১৯ এর ফলে সারাবিশ্বে যে প্রভাব, সেই প্রভাবে সবার আগে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রি। এর ফলে তার সঙ্গে ট্যুরিজম ও হোটেল ইন্ডাস্ট্রিও ক্ষতির মুখোমুখি। আর যদি আমার প্রতিষ্ঠান ইউএস বাংলার কথা বলতে হয়, তবে সারাবিশ্বের আকাশ পথের যে অবস্থা ইউএস বাংলারও একই পরিস্থিতি। কিন্তু এখান থেকে আমরা উত্তরনের জন্য কাজ করছি।ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন?
কামরুল ইসলাম : এই লকডাউনের সময়ও বিজনেসকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি। লকডাউনের শুরু থেকেই ঢাকা-গুয়াংজু ফ্লাইট চালু ছিলো। সেখানে বাংলাদেশি ফ্লাইট হিসেবে ইউএস বাংলা ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। তবে পরে সে সংখ্যা কমে যায়। প্রতি সপ্তাহে ১টা করে ফ্লাইট আমরা ঢাকা-গুয়াংজু চালু রেখেছি। পহেলা জুন অভ্যন্তরীণ রুটে স্বল্প পরিসরে ফ্লাইট চালু হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুর, ১১ জুন থেকে যশোর ফ্লাইট চালু হয়। এখানে শুরু থেকে ইউএস বাংলা ফ্লাইট চালু রেখেছে। কিন্তু যাত্রীদের সংখ্যাটা আনুপাতিক হারে অনেক কম। যেটা আসলে এয়ারলাইন্স চালানোর মতো নয়। এরপরও সীমিত আকারে ফ্লাইট চালু রেখেছি আমরা।আরও জানতে : ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের সকল ঠিকানা ও নাম্বারসমূহ
এছাড়াও গত ৪ মাস ধরে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে অনেক বাংলাদশি বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা, ভ্রমণে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশে বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে আটকে যায়। সেসব গন্তব্য থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলো বিশেষ ফ্লাইট পরিচালানা করেছে ইউএস বাংলা। যেমন চেন্নাইতে আমরা ফ্লাইট পরিচালনা করেছি ১৫ টি। তাছাড়া ব্যাংককে, কুয়ালালামপুরে, দুবাই, আবুধাবিতে ফ্লাইট পরিচালনা করেছি। এই সময়টাতে আমরা কার্গো ফ্লাইটগুলো চালু করেছি স্বল্প পরিসরে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা বিজনেসকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করেছি। কেননা, ইউএস বাংলায় ১৪ শ' এর ওপরে কর্মচারী কর্মরত আছেন।
তাদের বেতন-ভাতা, অফিস পরিচালনা, এয়ারলাইন্স পরিচালনার ইউটিলিটি চার্জ, এয়ারলাইন্সের লিজিং কস্ট, তারপর লোন; সবকিছু মিলিয়ে একটা নিয়মিত খরচ আছে কোম্পানির, তা যেন উঠিয়ে আনা যায়, সে চিন্তা করে আমরা ফ্লাইট চালু রাখার চেষ্টা করেছি।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : লকডাউনের ফলে কোন কোন সমস্যা/সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইউএস বাংলা?
কামরুল ইসলাম : ক্ষতি ও সমস্যা তো অনেক বড়। লকডাউনের ফলে বিরাট সংকট যাচ্ছে। প্রতি মাসে যেখানে শত কোটি টাকার ওপরে আয় থাকার কথা, সেখানে প্রায় আয় থেকে বঞ্চিত হওয়া, গত চার মাসে অপারেশনাল যে ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় যেমন এয়ারলাইন্স অপারেটরের ১৩টি প্লেনের লিজিং কস্ট, ইন্সুরেন্স কস্ট, ব্যাংক লোনসহ বিভিন্ন চার্জেস আছে, যেমন প্লেনগুলোর পার্কিং চার্জ, স্টাফদের ব্যয়, অফিস পরিচালনার খরচ ইত্যাদি সবকিছুই আগের মতোই চালাতে হচ্ছে। মূলত শুধু আয়টাই নেই। বাকি সবকিছুই আগের মতোই আছে। তারপরও এই সময়টা যেহেতু সারাবিশ্বে সমস্যা, সারা বিশ্বের এয়ারলাইন্স ব্যবস্থায় একই রকম সংকট, সেখানে আমাদের আসলে ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারি সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা আসলে কঠিন।ট্রাভেল বাংলাদেশ : সরকারি সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সার্বিক আপডেট কি?
কামরুল ইসলাম : সরকারের কাছে আমরা বিভিন্ন সহায়তা চেয়েছি। বিশেষ করে ফ্লাইট পরিচালনা করতে যেসব চার্জেসগুলো আছে, সেগুলো যেন মওকুফ করে দেয়া হয় তার জন্য অনুরোধ করেছি। যদি এসব ক্ষেত্রে এভিয়েশন সংস্থাগুলোকে ছাড় দেয়া হয় তাহলে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে। সবকিছু আসলে নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : এই বিষয়ে সরকারের কাছে কোন ধরনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে আপনাদের পক্ষ থেকে?
কামরুল ইসলাম : আমরা ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে প্রপোজাল দিয়েছি সরকারের কাছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রুটের যে চার্জেসগুলো আছে সেগুলো ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যে চার্জেসগুলো আছে সেগুলো যেন স্বল্প সময়ের জন্য মওকুফ করা যায় তা বিবেচনার জন্য প্রপোজাল দিয়েছি। আমরা যতটুকু জানি, এটা ইতোমধ্যে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আছে সিদ্ধান্তের জন্য।আরও পড়ুন : চিকিৎসা সেবায় জড়িতদের বিনামূল্যে পিপিই দেবে ইউ এস বাংলা
আশা করছি আমাদের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয় তাহলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে আমাদের যে প্রতিযোগিতা আছে তাতে টিকে থাকা হয়তো কিছুটা সহজ হবে। যদি আমরা এটা টিকিয়ে রাখতে না পারি তাহলে এভিয়শন ইন্ড্রাস্ট্রির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে আমাদেরকে টিকিয়ে রাখাটা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা চাই সরকার আমাদের পাশে থাকুক।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : সবকিছু স্বাভাবিক হলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বিমান ভাড়া কেমন হতে পারে?
কামরুল ইসলাম : এই যে আমরা পহেলা জুন থেকে বিমান চলাচল করেছি, তাতে স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা আছে। তার ওপর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ভ্রমণ করছে না। এই অবস্থায় যাত্রী কমে গেছে। কাজেই একদিকে স্বাস্থ্যবিধির ফলে ফ্লাইট পরিচালনার ব্যয় বেড়ে গেছে, অন্যদিকে যাত্রী হ্রাস পেয়েছে। ফ্লাইট পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যেকটা ফ্লাইট জীবাণুমুক্ত করতে হয়, যাত্রীদের হ্যান্ডগ্লাভস ও মাস্ক দিতে হয়, কোচগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেন্টেন করতে হয়। এতে করে অপারেশন কস্ট বাড়ছে। তারপরও পূর্বের তুলনায় ফ্লাইটের ভাড়া কমিয়ে দিতে হয়েছে। যাত্রীদের এয়ারলাইন্সমুখী করার জন্যই এমনটা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়ে গেলেও এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার স্বার্থে এই মুহুর্তে ভাড়া বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না।ট্রাভেল বাংলাদেশ : ফ্লাইট চলাচল কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে?
কামরুল ইসলাম : এটি আসলে শুধু আমাদের দেশের ওপরই নির্ভর করছে না। আমরা যে দেশে যেতে চাই সে দেশের অবস্থা কতোটা নিরাপদ, তারা উন্মুক্ত করছে কিনা তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। মূলত কোভিড-১৯ আক্রান্তের হার যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক হচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের স্বাভাবিক যাত্রা করা কঠিন হবে। এই অবস্থায় ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিক হবে, তা ভাবার কারণ নেই।প্রকাশের তারিখঃ ৬ই জুলাই, ২০২০
সাক্ষাৎকার নিয়েছেনঃ সাইফুল্লাহ সাদেক
এস এম


