উজানী রাজবাড়ি : ঔপনিবেশিক জমিদারির এক ভগ্নপ্রায় নিদর্শন
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কারুকার্যখচিত জমিদার বাড়িটি তৈরি হয়েছিল জমিদারদের বসতের জন্য
উজানী রাজবাড়ি, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ। ছবি : ভ্রমণ গাইড
ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস অনেক পুরনো। হিন্দু অধ্যুষিত এই অঞ্চল দীর্ঘকাল ছিল ইউরোপিয়ান শাসনের অধীনে। বিশেষ করে ব্রিটিশরা এই অঞ্চল শাসন করে গেছে প্রায় ২০০ বছর। ঔপনিবেশিক সব শাসনামলেই স্থানীয় শাসন, বিচার এবং শৃঙ্খলা বজায়ের জন্যে জমিদারি প্রথা চালু ছিল। ব্রিটিশ সম্রাজ্যের স্তিমিত সূর্যের সাথে সাথেই দেশভাগের পরে এইসব জমিদারী প্রথার বিলোপ ঘটে। হারিয়ে যায় জমিদারি, কিন্তু দেশজুড়েই রেখে যায় তাদের এক সময়ের প্রভাব-প্রতিপত্তির চিহ্ন। সারাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব জমিদার বাড়ি আমাদের অতীতকে বহন করে, সাক্ষ্য দেয় প্রাচীন এক আমলের। চলুন জেনে আসা যাক তেমনই এক জমিদার বাড়ি সম্পর্কে। মধুমতির তীরঘেষে অবস্থান করা জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত গোপালগঞ্জ জেলা। এই জেলার মুকসুদপুর উপজেলায় রয়েছে হারানো জমিদারির এক নিদর্শন, উজানী রাজবাড়ি। মুকসুদপুর উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণদিকে মুকসুদপুর-উজানী সড়কে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী উজানী ইউনিয়নের উজানী নামক গ্রামে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঔপনিবেশিক আমলে মহারানী ভিক্টোরিয়ার আমলে যশোর থেকে রায় গোবিন্দ এবং সুর নারায়ণ নামে দুই জমিদার বংশধর গোপালগঞ্জ জেলায় আসেন এবং এই উজানী গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা তেলিহাটি পরগণার প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমি নিয়ে তাদের জমিদারীর গোড়াপত্তন করেন। তাদের বসবাদের এবং জমিদারির সুবিধার্থে এই অঞ্চলে তারা বেশ কয়েকটি দ্বিতল এবং ত্রিতল প্রাসাদ নির্মাণ করেন যার মধ্যে উজানীর এই প্রাসাদ যেটি 'উজানী রাজবাড়ি' নামেই বেশি পরিচিত সেটি অন্যতম।
নোনাধরা দেয়াল আর আগাছা যেন ফুটিয়ে তুলেছে সংস্কারের অভাবকে। ছবি : বাংলা ট্যুর টুডে ডট কম
জমিদার সুর নারায়ণের বংশধর অশীতিপর সমরেন্দ্র চন্দ্র রায়ের কাছ থেকে জানা যায় এই সমগ্র অঞ্চলজুড়ে তার পূর্বপুরুষদের ৭টি জমিদারি ছিল তৎকালীন আমলে। দেশভাগের পর জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটলে এখানকার জমিদারগণ ভারতে পাড়ি জমালেও পৈতৃক ভিটেবাড়ি আগলে পড়ে থাকেন সমরেন্দ্র। তার কাছ থেকে আরও জানা যায়, নামে-বেনামে এই জমিদারির অধীনে থাকা সম্পত্তি ধীরে ধীরে হাতছাড়া হতে থাকে তাদের পরিবারের কাছ থেকে। একসময় চান্দার বিলসহ বিশাল এলাকা ছিল এই জমিদারির অধীনে, যেগুলোর কিছু হাতছাড়া হয়ে যায় আর কিছু দলিল তহশীল বিনষ্ট হয়ে যায় বাংলা ১৩৫২ সালের প্রলয়ংকারী ঝড়ে। প্রাসাদ ছাড়াও উজানী রাজবাড়ি প্রাঙ্গনে রয়েছে বৈঠকখানা, সানবাধানো বিশাল পুকুর, মঠ এবং মন্দির।
কালের পরিক্রমায় এসব নিদর্শন আজ অনেকটাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জমিদারদের নির্মিত সু-বিশাল মঠটি প্রায় ৩০ হাত মাটির নিচে ডেবে গেছে, চূড়াটি শুধুমাত্র উঁকি দিচ্ছে মাটির উপরে। প্রাসাদ সংলগ্ন কালীমন্দিরটিও টিকে আছে ভগ্নদশায়। কালি মন্দিরের অষ্টধাতুর বিগ্রহটি বহুকাল আগেই মানুষের লালসার শিকার হয়েছে। জমিদার বাড়ির পাশেই দেখা মিলবে টলটলে কাকচক্ষু জলের সু-বিশাল দীঘি। অত্র পুরা অঞ্চলজুড়েই উজানীর এই দুই জমিদারের পত্তন করা স্থাপনা এবং নিদর্শন মিলবে। উজানীর অদূরে মহাটালী গ্রামে রয়েছে প্রাচীন এক মন্দির এবং ধর্মরায়ের বিশাল দীঘি। এছাড়াও ১৫ কিলোমিটার পূর্বে রাজৈর উপজেলার খালিয়াতে রয়েছে অনুরূপ প্রাসাদ, মন্দির, মঠ এবং সানবাধানো ঘাঁট যার সাথে উজানীর জমিদার বাড়ির স্পষ্ট মিল লক্ষ্য করা যায়। এই খালিয়া জমিদারবাড়ি এবং তৎসংলগ্ন জমিদারি এলাকা তারা দুজন জমিদার রাজা রামমোহন রায়চৌধুরীকে দান করেছিলেন।
রাজবাড়ির পেছনের অংশ। ছবি : ভ্রমণ ইনফো
সময়ের ঘূর্ণিচক্রে আজ নেই সেই জমিদারগণ, নেই তাদের সেই শানশওকত, জৌলুস আর আভিজাত্য। একসময় যে রাস্তায় দাম্ভিকতার সাথে জমিদারদের হাতিঘোড়া চলত সে রাস্তা আজ মানুষের চলাচলের অভাবে জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। শত বছরের ইতিহাস বুকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে শুধু তাদের রেখে যাওয়া প্রাসাদ আর মন্দিরের ধংসাবশেষ। আর কালের স্মৃতি হাতড়ে বেচে রয়েছেন এই জমিদারদের এক উত্তরপুরুষ। ঘুরে আসতে পারেন উজানী রাজবাড়ি থেকে, অনুভব করে আসতে পারেন প্রাচীন সেই ইতিহাসকে। পুরনো ইতিহাসই আমাদের শেকড়, ইতিহাসকে আগলে ধরেই হোক নতুন এক সময়ের সূচনা।
কীভাবে যাবেন : উজানী রাজবাড়ি দেখতে হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনাকে যেতে হবে গোপালগঞ্জের অন্তর্গত মুকসুদপুর উপজেলায়। ঢাকার গাবতলী, সায়দাবাদ, ফুলবাড়িয়া ইত্যাদি স্থান থেকে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, আমিন পরিবহন, সেবা পরিবহন, পান্না ডিলাক্স, গ্রীণলাইন, ইমাদ ইত্যাদি পরিবহনের বাস গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, ঢাকা থেকে সড়ক পথে গোপালগঞ্জের দূরত্ব ২০৯ কিলোমিটার এবং সময় লাগবে সাড়ে ৫ থেকে ৬ ঘন্টার মত। বাসভেদে ভাড়া পড়বে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। গোপালগঞ্জ সদর থেকে উজানী রাজবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইন কিংবা ঘোনাপাড়ায় বাস থেকে নেমে সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা, সিএনজি ইত্যাদি নিয়ে উজানী বাজারের দক্ষিণদিকে অবস্থিত উজানী রাজবাড়িতে পৌঁছোতে পারবেন।
তথ্যসূত্র : mailto:https://thedhakatimes.com/125820/travel-visit-the-ujjani-palace-to-witness-history/ mailto:https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%89%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%B0_%E0%A6%9C%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%BF mailto:https://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDlfMTZfMTNfM181N18xXzcxNjYx