বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খাঞ্জেলী দীঘি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: খাঞ্জেলী দীঘি স্থানীয়ভাবে 'ঠাকুর দীঘি' নামেও পরিচিত

খাঞ্জেলী দীঘি

প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর ঐতিহাসিক খাঞ্জেলী দীঘি; ছবি : সদর বাগেরহাট ডট গভ


বয়ে যাওয়া ভাংগ্রা, পানগুছি, পশুর, গোসাইরখালী  হরিণঘাটা, মধুমতী, মংলা, বলেশ্বর, নদী দিয়ে বিধৌত বাগেরহাট জেলা। এই জেলাটি মূলত ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং হজরত খান জাহান আলী (র:)-এর মাজারের জন্য অধিক পরিচিত। তবে, এর বাইরেও কিছু ঐতিহাসিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ জায়গা রয়েছে যা হয়তো বা অনেকের কাছেই অজানা। তেমনই একটি জায়গা হলও খাঞ্জেলী দীঘি।

ইতিহাস

এই দীঘি নিয়ে প্রচলিত আছে নানান কথা। কেউ কেউ আবার এই দীঘিকে 'ঠাকুর দিঘি'ও বলে থাকেন। আজকের লেখায় কথা হবে খাঞ্জেলী দীঘি নিয়ে। চলুন জেনে নেয়া যাক, খাঞ্জেলী দীঘি নিয়ে কিছু তথ্য। বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত হযরত খানজাহান (র:)-এর মাজার। আর সেই মাজারের দক্ষিণ দিকে প্রায় ২০০ বিঘা জমি নিয়ে অবস্থিত খাঞ্জেলী দীঘি। কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড় নামে দুটি কুমির হজরত খান জাহান আলী (র:) এই দীঘিতে ছেড়েছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য এই কুমিরগুলো মারা যায়।

আরও পড়ুন : বাগেরহাট জাদুঘর : ইউনেস্কো ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত

এরপর মিঠা পানির কিছু কুমির এই দীঘিতে ছাড়া হয়। বলা হয়ে থাকে যে, সেই কুমিরগুলোর বংশধর এখনও পর্যন্ত সেই দিঘীতে বেঁচে আছে এবং কুমিরগুলোকে ডাকলে সেগুলো কাছে আসে। খাঞ্জেলী দীঘির পানি বেশ সুপেয়। অনেকেই নানান রোগ থেকে সেরে ওঠার জন্য খাঞ্জেলী দীঘির পানি পান করে থাকেন এবং দীঘিতে গোসল করেন। মনোবাসনা পূরণের জন্যও অনেকে আবার এই দীঘিতে এসে গোসল করে যান। হজরত খান জাহান আলী (র:)-এর মাজার জিয়ারত করতে আসা লোকজন এই দীঘির এ কুমিরগুলোকে ভেড়া, হাঁস, খাসি মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের পশু মান্নতের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। ষাট গম্বুজ মসজিদের জাদুঘরে কালা পাহাড় মারা যাওয়ার পর তা মমি বানিয়ে রাখা হয়েছে। খাঞ্জেলী দীঘির প্রধান ঘাঁটটি বেশ সুন্দর ও আয়তনে প্রশস্ত। সেখানে মহিলাদের জন্য আছে আলাদা ঘাঁট। খাঞ্জেলী দীঘিকে 'ঠাকুর দীঘি'ও বলা হয়ে থাকে।

খাঞ্জেলী দীঘি

খাঞ্জেলী দীঘির প্রধান ঘাঁট, এর বাম পাশে মহিলাদের জন্য ঘাটটি রয়েছে; ছবি : পরিবর্তন ডট কম


নামকরণ

খাঞ্জেলী দীঘির নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেকেই বলেন বুদ্ধ ঠাকুরের মূর্তি লাভের জন্য এই দীঘির নাম হয় 'ঠাকুর দীঘি'। আবার অনেকের মতে, হজরত খান জাহান আলী (র:)-কে দেশীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভক্তিভরে 'ঠাকুর' বলতেন। আর তাঁরই বিশেষ তত্ত্বাবধানে খাঞ্জেলী দীঘি খনন করা হয়। তাই তাদের পরম ভক্তির ঠাকুরের নামের ভিত্তিতেই একে বলা হতো ঠাকুর দীঘি। অনেকেই আবার বলেন, খান জাহান আলীর প্রিয়তম বন্ধু ছিলেন পীর আলী মোহাম্মদ তাহের। আগে তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। আর তার নাম ছিল শ্রী গোবিন্দ লাল রায়। খান জাহান আলী (র:) তাকে স্নেহ ভরে ‘ঠাকুর’ বলে ডাকতেন। আর সেই পীর আলী মোহাম্মদ তাহের এর স্মৃতি রক্ষার্থেই খান জাহান আলী এ দীঘির নাম রেখেছিলেন 'ঠাকুর দীঘি'। পীর আলী মোহাম্মদ তাহের এর মাজার খান জাহান (র:)-এর মাজার সংলগ্ন পশ্চিম দিকে অবস্থিত।

আরও পড়ুন : ঘোড়া দীঘি, বাগেরহাট: খানজাহান (রঃ) এর খননকৃত এ অঞ্চলের প্রথম দীঘি

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি যাওয়া যায় বাগেরহাটে। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে প্রতিদিন সকাল ৬টা-১০টা পর্যন্ত ও সন্ধ্যা ৭টা-রাত ১০টা পর্যন্ত অনেকগুলা বাস ছেড়ে যায়। যাওয়ার আগে টিকিট বুকিং দিয়ে নেয়া ভালো। এছাড়া ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত ট্রেনেও যেতে পারেন। আন্তঃনগর ট্রেন চিত্রা এক্সপ্রেসে এবং সুন্দরবন এক্সপ্রেসে খুলনায় গিয়ে তারপর বাসে করে যেতে পারেন বাগেরহাটে। প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে রূপসা থেকে বাগেরহাটে যেতে। বাগেরহাট জেলা থেকে অটোরিকশাতে করেও খাঞ্জেলী দীঘিতে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

বাগেরহাট সদরে নানান হোটেল আছে। এছাড়াও আছে সরকারি গেস্ট হাউজ। তাছাড়া আশেপাশে যেসব হোটেল আছে সেগুলোতেও থাকতে খুব বেশি খরচ পড়বে না। তবে যাওয়ার আগে ভালো করে খোঁজ নিয়ে এবং বুকিং দিয়ে যাওয়া ভালো। খুলনা থেকে বাগেরহাটে আসতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই খাঞ্জেলী দীঘি দেখতে গিয়ে খুলনাতেও থাকতে পারেন। খুলনাতেও হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেখানেও আগে থেকে খোঁজ নিয়ে যাওয়া ভালো। 

 ফারিয়া এজাজ   এস এম

তথ্যসূত্র: http://bagerhat.gov.bd http://www.obhijan.com


Click Here To See More