কী ঘটেছিলো একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিতে?

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভাষার দাবিতে ছাত্রজনতার সাথে সাধারন জনতা মিলিত হয়েছিল

21-february অতীত সময়ের কিছু খন্ডচিত্র। ছবি : কুইজার্ড

 ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগেই ভাষাবিষয়ক আলোচনা শুরু হয়েছিল। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক এর লেখা 'ভাষা আন্দোলন-ইতিহাস ও তাৎপর্য' বইতে বলা হয়েছে , "ভাষা আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়।.......এর সূচনা মূল আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক দশক আগেই এবং বাঙালি মুসলমানের সেকুলার জাতিয়তাবোধ এর পেছনে কাজ করেছে"। প্রথমদিকে ভাষাসৈনিকেরা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভাষা আন্দোলনকে দেখলেও ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও বির্তকের জন্ম দেয় ভাষা সংক্রান্ত বিষয়াদি। এছাড়াও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া হাজার মাইল দূরের দুটি রাষ্ট্র কিভাবে তাদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিলোপ করে যোগসূত্র স্থাপন করবে এ নিয়ে তৎকালীন বাংলাভাষীদের মধ্যেও বিরোধ সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কিছু পরেই পাকিস্তানের ডাকটিকেট, মুদ্রা, ট্রেনের টিকেট ইত্যাদি থেকে বাংলা বাদ দিয়ে উর্দুতে ছাপা হওয়া শুরু হয়। পর্বর্তীতে ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে ঘোষণা করেছিলেন 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা'। বাঙালি বিভিন্ন সংগঠন, সচেতন ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীরা আরো আগে থেকেই এসবের প্রতিবাদ করতে থাকেন। মিছিলের আগে এই জমায়েতে স্বতঃস্ফূর্ত হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিল ঐতিহাসিক আমতলায়। ছবি : সামহয়ার ইন ব্লগ ডট নেট

এর মধ্যে ১৯৫২সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের অ্যাসেম্বলিতে এক সম্মেলনে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়। পরেরদিন ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে এক সমাবেশে খাজা নাজিমুদ্দিনও একই কথা বলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে পূর্ব বাংলায়। ৩০জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার স্বার্থে 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। এই পরিষদের সিদ্ধান্তে ১৯৫২সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। অন্যদিকে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ধর্মঘট, সভা, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১-৪ ভোটে গণতান্ত্রিক উপায়ে ১৪৪ ধারা না ভেঙে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও ফজলুল হক ও সলিমুল্লাহ হলে ছাত্রদের অপর দুটি সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরেরদিন বৃহস্পতিবার ৮ ফাল্গুন, ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলা প্রাঙ্গণে জমায়েত হন। বেলা সাড়ে ১২টায় ছাত্রনেতা গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সেদিনকার সভা শুরু হয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের শামসুল হক ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে থাকলেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদের চেতনায় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রতিবাদে ছাত্ররা মিছিলে অগ্রসর হয়। মিছিলের গতিরোধে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস, লাঠিচার্জ আর গুলির আশ্রয় নেয়। ফলশ্রুতিতে শহীদ হন রফিক, শফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা আরও অনেকে। নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয় বহু সংখ্যক মানুষকে। অনেকের মতে, ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নয় বরঞ্চ ২২শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণমানুষের আন্দোলন হিসেবে এবং ঐদিনই বেশি মানুষ মারা যায়। যেভাবেই হোক '৫২ পরবর্তী অধ্যায়ে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং তখন থেকেই এই দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।    


তথ্যসূত্র : https://www.bbc.com/bengali/news-51550921 https://www.dailyinqilab.com https://www.jugantor.com/todays-paper


Click Here To See More