যেভাবে আসলো বঙ্গাব্দ, নামকরণ হলো বাংলা বারো মাস ও সাত দিনের?
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বাংলা মাস ও দিনের নামকরণ হয় নক্ষত্র ও তারকামণ্ডলীর নামানুসারে
শৈশবে আমরা কম-বেশি সবাই মুখস্ত করে এসেছি বাংলা বারো মাসের নাম। এরমধ্যেই অনেকেই আমরা এই নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয়নি। হুট করে তো আর কোনো কিছুর নাম দেয়া যায় না, নামকরণের পেছনে নিশ্চই কোনো ভিত্তি থাকে। কীসের ভিত্তিতে বাংলা বারোটি মাসের নামকরণ হয়েছে তা আজ ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জানানো হবে। তবে, তার আগে আমাদের বঙ্গাব্দের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিতে হবে। পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তির এই যুগে এসে আমরা হয়তো পঞ্জিকা সম্পর্কে সামান্য ধারণাই রাখি। তবে, সভ্যতার শুরুটা কিন্তু এই পঞ্জিকা বিনির্মাণে মধ্যে নিহিত। যেসব আবিস্কার মানুষকে হাজার হাজার বছর এগিয়ে নিয়ে গেছে তার মধ্যে এই পঞ্জিকা আবিস্কার অন্যতম। চন্দ্র-সূর্যের গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে দিনক্ষণের হিসাব নিকাষ করতো। আর তার মোতাবেক ক্ষেতে নামতো চাষীরা। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা কিংবা নীলনদের প্রাচীন সভ্যতায় মাঝবয়সী কৃষক দিন-তারিখ দেখে, ঋতু বুঝেই ক্ষেতে নামতো। তাদের পরে রোমান সভ্যতার হাত ধরে আসে খ্রিস্টাব্দ ধারণা। তবে, ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিষ্টাব্দের ধারণা আনে পর্তুগীজরা। আর এটিকে জনপ্রিয় করেছে ইংরেজরা।
বঙ্গাব্দ

ইউরোপিয়ানদের আগে উপমহাদেশের মাটিতে পা ফেলেছিল আরব-তুর্কি-আফগানরা এবং সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে হিজরি সন। নবী মুহম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। আর সেই বছরটাকে ভিত্তি ধরে পরবর্তীতে হিজরি পঞ্জিকার উদ্ভাবন ঘটে। বস্তুত হিজরি সনই প্রথম বিশুদ্ধ চান্দ্র সন। প্রাচীন আরবে মাস চান্দ্র হলেও বছর ছিল সৌর। বঙ্গাব্দের প্রচলনের ক্ষেত্রে এই হিজরি সনের ভূমিকা আছে। হিজরি সনের কিছু দুর্বলতা বঙ্গাব্দ প্রচলণের তাগিদ বাড়িয়ে দিয়েছিল সম্রাট আকবরের সময়। চাঁদনির্ভর মাস পার হয়ে প্রতিবছর এগারো দিন পিছিয়ে পড়তো তারা। কারণ, সৌর বছর ৩৬৫ দিনে হলেও চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিনেই আটকে যায়। এভাবে একমাস পিছিয়ে গেলে পরের বছর নববর্ষ পালিত হতো ১ মাস পরে।
অর্থাৎ সে বছরে ত্রয়োদশ মাস হিসাবে আরেকটা মাস যোগ হতো। ভারতীয় উপমহাদেশের নানান সময়ের বিভিন্ন শাসকের নামে একেকটা সনের প্রচলণ ঘটেছিল। যেমন : বিক্রমাদিত্যের নামে বিক্রমাব্দ, চতুর্থ শতকের দিকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামে গুপ্তাব্দ, উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের নামে হর্ষাব্দ, সম্ভাব্য শক-ক্ষত্রপদের নামে শকাব্দ ছিল সবচেয়ে পরিচিত। তবে এসব সন যেভাবে বলা যাচ্ছে বঙ্গাব্দ সেভাবে বলে দেয়াটা বেশ কঠিন।

বঙ্গ কোনো শাসকের নাম নয় বরং এটা একটা আঞ্চলিক পরিচয়। হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা এক জনপদের নাম। প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় মানুষেরা জীবনযাপনের তাগিদে ঋতুর হিসেব রাখতো, তেমন ভাবনা স্বাভাবিক। তারপরেও বঙ্গাব্দের জন্মকথায় চারজন শাসকের দাবি নিয়ে পণ্ডিতেরা বিভাজিত। তিব্বতিয় রাজা স্রং সন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ এবং মহামতি সম্রাট আকবর।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যার নাম শোনা যায় তিনি হচ্ছে মোঘল সম্রাট আকবর। তার শাসনামলেই মূলত বঙ্গাব্দ ব্যাপকাকারে ছড়িয়ে পড়ে। পণ্ডিতদের অধিকাংশের মতেও সম্রাট আকবরের পক্ষেই বঙ্গাব্দ প্রচলনের পক্ষে রায়। তার আমল ছিল মধ্যযুগের ভারতে স্বর্ণযুগ হিসাবে গণ্য। শাসন, তদারকি এবং রাজস্ব আদায় সহজ করার জন্য গোটা সাম্রাজ্যকে ভাগ করেন আকবর।টোডরমলের তত্ত্বাবধানে প্রবর্তিত হয় নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা, যা দশসালা বন্দোবস্ত নামে স্বীকৃত। ঠিক কাছাকাছি সময়ে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নতুন সনের সূচনা ঘটে জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর তত্ত্বাবধানে। আকবরের প্রবর্তিত এই নতুন সন পরিচিতি পায় ‘ইলাহি সন’ হিসাবে। হিজরি সন পুরোপুরি চন্দ্র নির্ভর হবার কারণে ভারতের ঋতুর সাথে মিলতো না। রাজস্ব আদায়েও অসুবিধা হতো। এজন্য মাসগুলোকে চন্দ্রনির্ভর রেখে বছরকে সৌর করে ঋতুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়। ফসলি সন হিসেবে এর কার্যকারিতা ছিল যুগোপযোগী। এদিকে ইলাহি সনে মাসের নাম ফারসিতে। মোঘল দরবার পারসিক সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল কী না! বারোটি মাস যথাক্রমে ফেরিদুন, উর্দি-বিহিস্ত, খুর্দাদ, তীর, মারদাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আজর, দে, বাহমন এবং ইসপন্দর মাজ। আকবরের দরবারি ঐতিহাসিক আবুল ফজলও তার আকবরনামাতে এই সন প্রবর্তনের কথা বলেছেন।

যদিও আকবর প্রবর্তিত সেই সনই বঙ্গাব্দ বলে প্রচলিত, তবে এই বক্তব্য পুরোপুরি সত্য নয়। আকবরের প্রচলিত সন তখনও বাংলায় চালু হয়নি, কারন যদি হতো, তাহলে তার নাম আকবরাব্দ বা ইলাহি অব্দ হতো। সেখান থেকে বঙ্গাব্দ হবার পেছনে নিশ্চই কোনো রহস্য আছে। আকবরের ইলাহি সন এবং বঙ্গাব্দের মধ্যে ইতিহাসের কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।
বঙ্গাব্দ
বাংলা সন এবং আকবরের ইলাহি সনের মধ্যে যে ঐতিহাসিক শূন্যস্থান, তা পূরণের জন্য মুর্শিদকুলী খান গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্যই আকবর ইলাহি সনের প্রবর্তন করেন। সেই সনকে ভিত্তি ধরে ঠিক রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্যই মুর্শিদকুলী খানের সময় বাংলা সন জন্ম নেয়। এই কারণে মাসের ফারসি নামগুলো পরিবর্তিত হয়ে গেল নক্ষত্রের নামানুসারে। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ… যেভাবে হলো বারো মাসের নাম :
বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ করা হযেছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। এই নামসমূহ গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ থেকে। বাংলা মাসের এই নামগুলো হচ্ছে :
- বৈশাখ–বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- জ্যৈষ্ঠ–জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- আষাঢ়–উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- শ্রাবণ–শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- ভাদ্র-উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- আশ্বিন–অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- কার্তিক–কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- অগ্রহায়ণ (মার্গশীর্ষ)–মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- পৌষ–পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- মাঘ–মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- ফাল্গুন–উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
- চৈত্র–চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
বিশেষ দ্রষ্টাব্য :
সম্প্রতি সরকারের নির্দেষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত ঐতিহাসিক দিবসগুলোকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে সমন্বয় করার জন্য বাংলা ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তনের কাজ করেছে। এই বছর থেকেই চালু হয়েছে এই পরিবর্তিত পঞ্জিকা। দেশে নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এখন থেকে বাংলা বছরের প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনে হবে। এর আগে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র---বছরের প্রথম এই পাঁচ মাস ৩১ দিন গণনা করা হত। এখন ফাল্গুন মাস ছাড়া অন্য পাঁচ মাস ৩০ দিনে পালন করা হবে। ফাল্গুন মাস হবে ২৯ দিনের, কেবল লিপইয়ারের বছর ফাল্গুন ৩০ দিনের মাস হবে।সাত দিনের নামকরণ বাংলা সন অন্যান্য সনের মতোই সাত দিনকে গ্রহণ করেছে এবং এ দিনের নামগুলো অন্যান্য সনের মতোই তারকামন্ডলীর উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।
- সোমবার হচ্ছে সোম বা শিব দেবতার নাম অনুসারে কারো মতে চাঁদের নাম অনুসারে
- মঙ্গলবার হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে
- বুধবার হচ্ছে বুধ গ্রহের নাম অনুসারে
- বৃহস্পতিবার হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের নাম অনুসারে
- শুক্রবার হচ্ছে শুক্র গ্রহের নাম অনুসারে
- শনিবার হচ্ছে শনি গ্রহের নাম অনুসারে
- রবিবার হচ্ছে রবি বা সূর্য দেবতার নাম অনুসারে
আরো পড়ুন ঃ আগামী ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের সব ফ্লাইট বাতিল
নাবিলা বুশরা এস এম


