হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন : শহরের ইতিহাস জানানোর এক অভিনব এজেন্সি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন




হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন

ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স



একসময় দুই বাংলার মধ্যে ছিল না কোনো সীমান্ত, ছিল না ভেদাভেদ। সংস্কৃতি, ভাষা এবং আরও অনেক প্রাসঙ্গিক যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে দেয়া হলো, সীমান্ত দেয়া হলো মাঝে। তাতে কী আর ইতিহাস ভাগ করা যায়। এই দুই বাংলার মানুষের অতীত ইতিহাস যে একই। পশ্চিম বাংলার ইতিহাসে যেমন পূর্ব বাংলার ছাপ পাওয়া যাবে, তেমনই পূর্ব বাংলার ইতিহাসেও দেখা মিলবে পশ্চিম বাংলার। উপমহাদেশের ইতিহাসে তাই দুই বাংলার ঠাই মেলে সমতালে। কোলকাতার ইতিহাস জানতে আমাদের অনেক আগ্রহ। বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে যে তার দেখা মেলে। হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন একটা শহরের ইতিহাসকে জানার জন্যে সেখানে হেঁটে বেড়ানোর চেয়ে উত্তম কিছুই নেই। এই যেমন আমাদের ঢাকা শহরে যদি এক বিদেশি পর্যটক আসে, সে এই শহরের আসল ইতিহাস আর ঐতিহ্য সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ঘুরেই জানতে পারবে কী? মোটেও না, যদি একটা শহরকে জানতে হয় তাহলে তা জানতে হবে সেই শহরে চড়ে বেড়ানোর মাধ্যমে। কোলকাতায় তেমন একটা ট্যুর এজেন্সি আছে, যারা পায়ে হেঁটে শহরকে দেখান, জানান কোলকাতার ইতিহাসকে। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ সেই ইতিহাস ও অভিনব এই এজেন্সির কথা জানানো হবে। হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন এর কাহিনী।


ইতিহাস

সূর্য সেন কোন কেবিনে চা খেতেন? কোথায় বসে চলত তাঁদের বিপ্লবের পরিকল্পনা? কোন গলিতে বসত ওয়াজিদ আলি শাহের মজলিশ? কোথায় সেই ঘাট, যেখান থেকে ক্রীতদাসদের নিয়ে দেশের প্রথম জাহাজ রওনা হয়েছিল সুরিনামের উদ্দেশে? তার থেকে কি অনেক দূরে সেই পাড়া, যেখানে প্রায় মলিন একটি চিনে মন্দির ঘিরে গড়ে উঠেছে আস্ত বসতি?


কফি হাউস - হেঁটে হেঁটে কোলকাতা দর্শন

ছবি : গেটি ইমেজ



এই কোলকাতা শহরের মধ্যে কতগুলি শহর আছে, ক’জন বলতে পারবে?  ব্যস্ত রাস্তা, শান্ত পথ, অলস গলিগুলো নিজ নিজ তালে এগিয়ে চলে। কখনও নিয়ে যায় সে কালের ক্যালকাটায়। কখনও আবার তা যায় কলিকাতা, কলকাত্তা কিংবা কইলকেতায়। সবই যে বসত করে এ কোলকাতার মধ্যেই। অতি পরিচিত, একান্ত আপন সেই মহানগরকে চিনতে গেলে তাই এখনও পায়ে হাঁটাই দস্তুর। পায়ে পায়ে পথ ফুঁড়ে ইতিহাস বার করে আনতেও তাই উৎসাহ জোগাচ্ছেন একদল অন্য ধাঁচের পথ-নির্দেশক। শুধু পথই দেখাচ্ছেন না, গল্প বলছেন না-দেখা পথেরও। বিদেশের ঢঙে শহর চেনানোর ভার নিচ্ছেন তাঁরা। ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন অতি আপন শহরের অজানা পাড়া, না ছোঁয়া ইতিহাস। দেশ-বিদেশ থেকে যাওয়া পর্যটকেরা যেমন সেসব ওয়াকিং টুরে অংশ নিচ্ছেন, তেমনই শামিল হচ্ছেন কোলকাতা শহরের অনেকেও। গাইডের বলা গল্পের সঙ্গে পা মিলিয়ে চিনে নিচ্ছেন শহরের অলিগলি। এই শহরে যত বাড়ছে ইতিহাসকে ফিরে দেখার কদর, ততই পায়ে পায়ে শহর চেনানোর এই ভ্রমণ পরিষেবায় যোগ দিচ্ছেন অনেকে। দেখাচ্ছেন, নিজের চেনা কোলকাতাটা। তাঁদের কেউ সরাসরি পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত থাকলেও, এমন অনেকেই আছেন যাঁরা অন্য কাজের ফাঁকে নিজেদের পড়াশোনা, ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে নিজের শহরের প্রতি ভালবাসা ভাগ করে নেন অন্যদের সঙ্গে। কেউ আবার পর্যটন ব্যবসায় নিজস্ব ছোঁয়া দেন পুরনো কোলকাতাকে মনে করিয়েই।


মারবেল পালেস

ছবি : সংগৃহীত


অভিনব

গত ১৭ বছর ধরে পর্যটকদের পায়ে হেঁটে শহর চেনান একটি ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার শুদ্ধব্রত দেব। শীতের মরসুমে তাঁর কাছে বিদেশি পর্যটকেরা ভিড় জমান কোলকাতার একান্ত আহ্লাদের ‘নলেজ স্ট্রিট’ ঘুরে দেখার জন্য। তিনি জানেন, ভিন্ দেশি পর্যটকেরা যেমন কলেজ স্ট্রিট পাড়া দেখতে ভালবাসেন এই ভাবে, এই শহরের অধিকাংশই তাতে আগ্রহী হবেন না। তবে, কোলকাতার লোকজনকেই তিনি ঘুরিয়ে শোনাতে চান এমন একটা কোলকাতার কথা, যা কি না জোব চার্নক আসার অনেক আগে থেকেই রীতিমতো কল্লোলিনী। তিনি বলছিলেন, ‘বেশির ভাগের মনেই এমন একটা ধারণা থাকে, যেন জোব চার্নক এসেই খুঁজে বার করেছিলেন এ শহরটাকে। তা তো নয়ই, বরং এই এলাকা ব্যবসার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাম করেছিল বলেই চার্নক এসেছিলেন। এ সব কথা শোনাই। দেখাই এর সপক্ষে বেশ কিছু ঐতিহাসিক এলাকাও।‘ পর্যটকদের জন্য তাই তৈরি করেছেন তিনি নানা পাড়ার ‘ওয়াকিং টুর’। শহরের ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য থেকে বাবু পাড়ার নানা ইতিহাসের কথা হেঁটে হেঁটে শোনান রামানুজ ও তাঁর সহকর্মীরাও। পুরনো সাহেব পাড়ার খাওয়াদাওয়া থেকে বঙ্গদেশের চিনে গিন্নিদের হেঁসেল, কিছুই বাদ পড়ে না। উৎসাহীদের নিয়ে যান বেলুড় মঠ, কুমোরটুলির মতো জায়গায়। চলতে চলতে গল্প বলেন সেই এলাকার। সাত বছর ধরে একটু একটু করে এ কাজ করছেন তাঁরা।


ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ইন্ডিয়া ।

ছবি : সংগৃহীত



ইতিহাস

শহর কোলকাতার ইতিহাস মানেই যে ইংরেজ শাসন কিংবা বাবুদের পাড়া— জন-মন থেকে এই গতানুগতিক ধারণাটাই সরাতে চান কলেজ শিক্ষক ও লেখক শামিম আহমেদ। তাই তিনি সকলকে মেটিয়াবুরুজের অলিগলিতে নিয়ে যান ওয়াজিদ আলি শাহের স্মৃতির ভগ্নাবশেষ দেখাতে। ঘুরে দেখান কোথায় বসত ঠুংরির আসর, কোথায় ছিল তাঁর পুরনো মসজিদ। কোলকাতার মধ্যেই যে ছোট্ট এক টুকরো লখনউ জন্ম নিয়েছিল এককালে এবং যথেষ্ট আদর পেয়েছিল বাঙালির, তা আর কত দিন অজানা থাকবে? এই শহরের ইতিহাসে আছে স্বাধীনতার বিপ্লব থেকে নকশাল আমলের নানা কথা। শুদ্ধব্রত বলছিলেন, ‘‘বিদেশিদের দেখানোর থেকেও এই শহরের তরুণদের সে সব কথা মনে করানোর উৎসাহ আমার এ ক্ষেত্রে বেশি। তাই দু’বছর পরিশ্রম করে একটা ওয়াক তৈরি করেছি। নাম অগ্নিযুগের কোলকাতা।’’ বিনা মূল্যের এই টুর তিনি করাচ্ছেন বাংলায়। ইচ্ছে একটাই— যেন ইতিহাস ভুলে না যায় তরুণ সমাজ। এভাবে শহর দর্শন ইতিহাসের জন্যেও কি গুরুত্বপূর্ণ? শামিম যেমন বিশ্বাস করেন, এটিও ইতিহাস চর্চার একটি মাধ্যম। শুধু বইয়ের পাতায় আটকে না রেখে, সেই চর্চা বরং সাধারণের মধ্যে এ ভাবে নিয়ে আসা যায় বলেই তাঁর মত।



দক্ষিণেশ্বর কালি মন্দির

ছবি : সংগৃহীত



একবার শীতের ছুটিতে কোলকাতায় ফিরে ওয়াকিং টুর-এ অংশ নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডস্-এর উট্রেকট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের শিক্ষিকা বর্ণিতা বাগচীও। তাঁর উপলব্ধি, যে শহরের এত রকম দিক থাকে, ইতিহাসের নানা পরত থাকে, তাকে চিনতে এমন ভাবেই ঘুরে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলছিলেন, ‘দক্ষিণ কোলকাতায় বড় হয়েছি, অথচ এই শহরের অন্য একটি প্রান্তের এত দিন ধরে থাকা আর্মেনিয়ান গির্জা, চিনা মন্দির তো আগে দেখিনি! সেখানে না গেলে, বইয়ে এই জায়গাগুলো সম্পর্কে শুধু পড়ে কোনও শহরের সংস্কৃতি বোঝা যায় না।’ তাই তাঁর মত, এই ধরনের ‘ওয়াকিং টুর’ শুধু নিছক বেড়ানো নয়, কোনও শহরের বেড়ে ওঠার ধারা বুঝতে গেলে এমন ভাবেই দেখা প্রয়োজন। শোনা দরকার, সে সব এলাকার মানুষদের কথা।  

নাবিলা বুশরা   এস এম