সেলুন : সমুদ্রের জিপসি নামে পরিচিত বিলুপ্তপ্রায় জাতি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: মিয়ানমারের মাইক দ্বীপপুঞ্জে বসবাস রয়েছে সেলুন উপজাতি গোষ্ঠির


moken _Selun (1) মকেন বা সেলুন উপজাতি

সমুদ্রের জিপসী নামে পরিচিত মিয়ানমারের সেলুন উপজাতিরা এভাবেই সমুদ্রের বুকে বসবাস করে আসছে; ছবি : ফ্লিকার


উপজাতি বলতে আমাদের কল্পনায় ভাসে বাংলাদেশের গারো, মারমা ইত্যাদি ধরণের উপজাতিদের কথা। যাদের বসবাস, রীতি, জীবনাচরণ আমাদের কাছে তাদের নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি করে। আজকে এমনই এক উপজাতির কথা বলা হবে। নিজেদের জীবনাচরণের জন্যে আজ তারা বিলুপ্তির পথে। মিয়ানমারে থাকা এই উপজাতি সেলুন নামেই পরিচিত। দক্ষিণ মিয়ানমারের তানিনথারি সমুদ্র উপকূলে সেলুন উপজাতি'র বাস।

মাইক দ্বীপপুঞ্জেই তাদের বসবাস। স্থানীয় ভাষায় মোকেন নামেও পরিচিত এই উপজাতিটি যাযাবরবৃত্তি করে দিনাতিযাপন করে। তাদের নির্মিত ছোট নৌকাগুলোতে করে তারা পুরো সমুদ্র ঘুরে বেড়ায়, মৎস্য শিকার, মুক্তার সন্ধান বা থাকার জন্যে উপযুক্ত বাসস্থানের খোজ করে থাকে তারা। সেলুন জাতি তাদের ছোট্ট নৌকায় করে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে ভ্রমণ করে। নৌকাই তাদের কাছে তাদের ঘর। তারা কখনোই মাটিতে তাদের বসতি স্থাপন করে না, শুধুমাত্র বর্ষার সময়ে অগত্যা তারা মাটিতে ঘর গড়ে তোলে। নীল জলের সমুদ্রে তারা সবসময় ভেসে বেড়ায় বলে তাদের 'সমুদ্রের জিপসী' বলা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন : দানি উপজাতি : সভ্যতা থেকে জনবিচ্ছিন্ন সবচেয়ে আদিম জাতি

উৎপত্তি

তাদের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত আছে। একদল মনে করে তারা অস্ট্রোনেশিয়ান জাতির অন্তর্ভুক্ত। আরেকদল মনে করে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে তারা দক্ষিণ চীন থেকে মিয়ানমারে বসতি গড়ে তোলে। মনে করা হয়, ১৭ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলো তখন বর্তমান মালয়েশিয়ার কাছে তারা অন্যদের কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সমুদ্রের জলেই তারা বসতি গড়ে তোলে। প্রথমে মালয় দ্বীপে বসতি স্থাপন করলেও মারুডাররা সেখানে আক্রমণ করলে তারা সেখান থেকে পালিয়ে মাইকে চলে আসে। এখানে প্রায় ৮০০ র মত দ্বীপ রয়েছে। আকারে অনেক দ্বীপই কিছু দ্বীপ রাষ্ট্রের চেয়ে বৃহত্তম।
moken _Selun (1) মকেন বা সেলুন উপজাতি

নিজদের তৈরি এমন নৌকাতে করেই একেক দ্বীপ ভ্রমণ, মাছ শিকার করে থাকা এই উপজাতীরা; ছবি : সংগৃহীত



ভাষা

মালয়ে প্রথমে বসতি গড়ে তোলার ফলে মালয়ের সাথে তাদের ভাষার বেশ মিল পাওয়া যায়। তাদের প্রায় চার ধরণের ভাষার খোজ পাওয়া যায়। তাদের নিজস্ব কোন ভাষা নেই। আমেরিকান একটি মিশনারি রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করে 'এ প্রাইমার অব দ্যা সেলুন ল্যাঙ্গুয়েজ' আবিষ্কার করেন।

পোশাক

পূর্বে সেলুনেরা কোন পোশাক পরিধান করত না। তারা মনে করত খালি গায়ে থাকলে তাদের কোন অসুখ হবে না। সমুদ্রের জলে সারাক্ষণ থাকার ফলে তাদের গায়ের চামড়া অনেকটা বাদামি রঙের হয়ে যায়। তবে এখন তারা বিভিন্ন ধরণের পোশাক পরিধান করে থাকে। নারীরা মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাপড়ে ঢেকে রাখে। পুরুষেরা লুঙ্গির মতো পোশাক পরে থাকে। সেলুন নারীরা তাদের মুখে একধরনের সাদা রঙ মাখে। সকল বয়সী সেলুন নারীদের মুখে এমন সাদা রঙ দেখা যায়।

আরও পড়ুন : উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট জাদুঘর, রাঙ্গামাটি

বিবাহপ্রথা

তাদের বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক থাকা বাধ্যতামূলক। পরিবারকে জানানোর পর তারা বিয়ের ব্যবস্থা করে দিবেন। কনেরা বিয়ের আগে একটি নৌকা তৈরি করেন, যাতে করে তারা বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে যায়। সেলুন বিয়েতে এই নৌকা তৈরি করা আবশ্যক।

শেষকৃত্য

বেশিরভাগ সেলুনেরা ম্যালেরিয়াতে ভোগেন। কেউ মারা গেলে সেলুনেরা তাদের কবর দেয় না। দূরের কোন একটি দ্বীপে রেখে দেয়। আর যদি দ্বীপ থেকে দূরে গিয়ে কোন সেলুনের মৃত্যু হয় তবে তাদের সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। যদি কোন নৌকার মালিক মারা যায় তবে তার নৌকা অর্ধেক কেটে সেটায় করে তাকে ভাসিয়ে দেয়া হয়।

ইন্দিরা বিশ্বাস   এস এম 


Click Here To See More