মোঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী সেনাপতি দিঘি : মাদারীপুর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শায়েস্তা খাঁর বড় ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ইসলাম খাঁ সেনাপতি দিঘি খনন করে



সেনাপতি দিঘি Senapati Dighi

ছবি : সংগৃহীত


দিগন্ত-জোড়া দিঘি মানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার। দিঘির আকাশে উড়ে চলা গাংচিলের দল অথবা উড়ে চলা পাখিদের কলকাকলি মুগ্ধ করে সকল প্রকৃতি প্রেমীদের। গোধূলি বেলায় অস্তমিত সূর্যের আভা স্বচ্ছ দিঘির জলে সৃষ্টি করে অনন্য সৌন্দর্যের। এই প্রাণবন্ত পরিবেশে কিছুটা আনমনা হতে কার না ভাল লাগে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই প্রাচীন দিঘিগুলোকে ঘিরে প্রচলিত আছে নানান লোককথা ও কল্পকাহিনী। তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী দিঘি হল সেনাপতি দিঘি (Senapati Dighi)। মাদারীপুরের অন্যতম এই প্রাচীন দিঘিটি সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের দিক থেকে অনেক সমৃদ্ধ। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের আমড়াতলা ও খাতিয়াল গ্রামের মাঝখানে সেনাপতি দিঘিটি অবস্থিত।

মাদারীপুরের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে সেনাপতি দিঘি অন্যতম। প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই দিঘিটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যেমন চমৎকার তেমনই এটিকে ঘিরে আছ ইতিহাস-ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ১৬৬৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর মোঘল আমলে শায়েস্তা খাঁর বড় ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ইসলাম খাঁ এই দিঘিটি খনন করেছিলেন। এজন্য এই দিঘিটির নাম হয় সেনাপতি দিঘি। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই দিঘিটি আজো তার সৌন্দর্য নিয়ে টিকে আছে আপন মহিমায়। বাঁশ ঝাড় দিয়ে ঘেরা এই দিঘিটি কখনোই শুকায় না। এই দিঘিতে অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে এবং ছুটির দিনগুলোতে অনেক মানুষ এখানে পিকনিক করতে আসেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এর বড় ছেলে ছিল ইসলাম খাঁ। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর নেতৃত্বে মগ জলদস্যুদের বিতাড়িত করার জন্য তার বড় ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁ ২৮৮টি নদীতে অভিযান পরিচালনা করেন। চট্টগ্রাম থেকে মগ জলদস্যুদের বিতাড়িত করে তার সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাকেরগঞ্জ বর্তমান বরিশাল অঞ্চলে অভিযান চালায়। সেখান থেকে মগ সৈন্যদের বিতাড়িত করে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। পথিমধ্যে তারা মাদারীপুরের এই জায়গায় অবস্থান করে। তাদের এই অবস্থান কালে পানির অভাব মেটানোর জন্য বুজুর্গ উমেদ খাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ইসলাম খাঁ এই দিঘিটি খনন করেন। আরও কথিত আছে, এই দিঘি খননের পর পানি না ওঠায় এখানে ঘোড়দৌড় হয়। ঘোড়দৌড়ের এক পর্যায়ে দিঘির দক্ষিণ দিক থেকে পানি উঠতে শুরু করে আর কিছু সময়ের মধ্যেই এই দিঘিটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে।

এই দিঘিকে ঘিরে আরও অনেক লোককথা প্রচলিত আছে। জনশ্রুতি আছে, আগের কালে যেকোন অনুষ্ঠানের সময় এই দিঘির কাছে গিয়ে থালা-বাসন চাইলে তা দিঘির পাড়ে উঠে থাকত। অনুষ্ঠান শেষে আবার দিঘির পাড়ে তা রেখে যেত হতো। না রেখে গেলে অমঙ্গল ঘটতো। আরও প্রচলিত আছে, এই এলাকায় একসময় একটি বিরাট বটগাছ ছিল। এই বটগাছটিতে প্রচুর হনুমান বসবাস করত। হিন্দুরা এই বটগাছ ও হনুমানকে দেবতা মানত। তাদের পূজোর জন্য এই দিঘিতে গোসল সেরে বটগাছের নিচে এসে পুজো দিত। এই দিঘিটিতে অনেক কাল ধরে হিন্দু-মুসলমানরা এসে নানান মানত করতো।


যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলি ও কেরানীগঞ্জ থেকে মাদারীপুর যাওয়ার বাস আছে। গাবতলি থেকে সার্বিক, চন্দ্রা ও সোহেল পরিবহনের বাস আছে। এরপর মাদারীপুর শহরের ইটেরপুল থেকে দক্ষিণ দিকে গগনপুর বাজার গিয়ে পশ্চিম দিকে রাস্তা দিয়ে সোজা রাস্তার মাথায় গেলে এই দিঘিটি অবস্থিত।

যেখানে থাকবেন : মাদারীপুর শহরে থাকার মতো বেশ কিছু হোটেল আছে। হোটেল মাতৃভূমি, সুমন হোটেল, হোটেল পলাশ, হোটেল সৈকত, হোটেল সার্বিক ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি হোটেল রয়েছে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম