ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট (এশিয়া পর্ব) : সিরিয়া-ইরাক-এর ঐতিহ্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আজকের সিরিয়া এবং ইরাক-এর ধ্বংসস্তুপ একসময়ের সমৃদ্ধ নগরী ছিল



সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

সিরিয়ায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পালমাইরা। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস


ওখানে প্রকৃতি মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পায় না। সেখানে সূর্যের আলোর চেয়ে বোমার আঘাতে উড়তে থাকা ধুলোর সাথেই মানুষের সখ্যতা বেশি। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর আইএস নামক এক বিভীষিকার কাছে যেখানে হার মেনেছে মানবতা। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের বিগত সব পর্বে সুন্দরের বর্ণনা এলেও, এবারের গল্প ধ্বংসযজ্ঞের। এশিয়ার দুই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ সিরিয়া এবং ইরাকের এমন কিছু ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের গল্প থাকছে এবার, যার বেশিরভাগই ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর হাতে ধ্বংস হতে চলেছে।


পালমাইরা (সিরিয়া)

প্রাচীন শহর পালমাইরা একসময় ছিল সিরিয়ার সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র। পালমাইরা শহরটি সিরিয়াতে ইসলামের আগমনেরও অনেক পূর্ব থেকেই বজায় ছিল। এমনকি প্রাচীন নথিপত্র অনুযায়ী খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকেই সিরিয়া কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্যের মূল ছিল পালমাইরা শহরটি। প্রাচীন এই শহরটি এতটাই পরিচিত ছিল যে এর কথা স্বয়ং বাইবেলেও উল্লেখিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মে মাসে এই অঞ্চলটি চলে যায় আইএস-এর দখলে। চরমপন্থীরা এই অঞ্চলের 'বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক প্রাচুর্য ধ্বংস করতে চায়' মর্মে সে সময়ের ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বকোভা বলেছিলেন, 'পালমাইরা শহরের সংস্কৃতি এবং অবকাঠামো বেশ কিছুর সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু বলে বিবেচিত। এটি সিরিয়ার নিজস্ব পরিচয় এবং ইতিহাস প্রাচুর্যতার একটি স্মারক হিসেবে চিহ্নিত'। বর্তমানে পালমাইরা শহরের যা অবশিষ্ট আছে তা মূল ঐতিহ্যের দেহাবশেষ বলা চলে।


বিখ্যাত টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা হাত্রা শহর, ইরাক, সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

বিখ্যাত টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা হাত্রা শহর, ইরাক। ছবি : আল জাজিরা




হাত্রা (ইরাক)

ইরাকের দূর্গ শহর হাত্রা। প্রাচীন এই শহরটির জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ২য় কিংবা ৩য় শতকে। পরবর্তীতে এই শহরটিই হয়ে যায় প্রথম আরব সাম্রাজ্যের রাজধানী। আগেই যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, হাত্রা মূলত ছিল একটি দূর্গ শহর। এর বিশাল দেয়ালগুলো শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। সভ্যতার উর্বরভূমি ইরাকে মেসেপোটেমিয়ান যুগে এসব স্থাপনা গড়ে ওঠে। আর দেয়ালগুলোতে প্রাচীন রোমান এবং পার্সিয়ান সভ্যতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।


প্রাচীন সিটি অফ গড, হাত্রা

প্রাচীন সিটি অফ গড, হাত্রা। ছবি : ইউনেস্কো


২০১৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, আইএস সদস্যগণ এই শহরের বিভিন্ন খোঁদাইকর্ম এবং ভাস্কর্য ভাঙনের উদ্যোগ নিয়েছে। তারা এই কাজে হাতুড়ির পাশাপাশি ব্যবহার করেছিল শক্তিশালী সব গোলাবারুদ। হাত্রা শহরের ভাগ্যে এরপর কি ঘটেছিল তা সহজেই অনুমেয়। প্রকাশিত সেই ভিডিওতে একজন আইএস সৈনিকের কথা শোনা গিয়েছিল, যার ভাষ্য ছিল, 'সেই ঈশ্বরের প্রশংসা করছি, যিনি আমাদের এবং আইএস সৈন্যদের বহু-ঈশ্বরবাদের এসব নিদর্শন ধ্বংস করার সক্ষমতা দিয়েছেন।'


প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর আশুরের অমূল্য ক্যালিগ্রাফি

প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর আশুরের অমূল্য ক্যালিগ্রাফি। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি


আশুর (সিরিয়া)

এটি সিরিয়ান আরেকটি প্রাচীন শহর যা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি। যদিও বর্তমানে এটি ইরাকের ভৌগলিক অঞ্চলে অবস্থিত তবে ২০০৮ সালে ইউনেস্কো এটিকে সিরিয়ান বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আশুর শহরটি আজ থেকে প্রায় ৩,০০০ বছর আগের একটি শহর। পরবর্তীতে শহরটি অ্যাসিরিয়ান সভ্যতার প্রথম রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। বলা হয়, মেসেপোটেমীয় সভ্যতার দেবতা আশুরের সহয়তায় নির্মিত হয়েছিল। যার কারণে শহরটির নামই হয়ে পড়ে আশুর। ধর্মীয়ভাবে সেই সময় শহরটির কদর ছিল অসামান্য। টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটির বর্তমান নাম কালাত শেরকাত।


যুদ্দবাজদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর আশুর।

যুদ্দবাজদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর আশুর। ছবি : উইকিপিডিয়া


 ২০০৩ সালে প্রথমবার বাঁধ নির্মাণের কারণে এই শহর নিয়ে উদ্বেগের কারণ জানায় ইউনেস্কো। কারণ বাঁধ ভেঙে বন্যার পানি উপচে আসলে এই শহরের ধ্বংস ছিল অনিবার্য। পরবর্তীতে আইএসের দখলে চলে গেলে শহরটি নিয়ে শঙ্কা বেড়ে যায় বহুগুণে।

আলেপ্পো (সিরিয়া)

টিভি পর্দায় সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞের খবর পেয়ে থাকলে এই শহরের নাম আপনার কাছে খুবই পরিচিত হবার কথা। আলেপ্পো নামের এই ঐতিহাসিক শহরটি সিরিয়ার রাজধানী না হলেও  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এবং ২০১২ সাল থেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার যতটা সমগ্র সিরিয়া হয়েছে তাঁর একটি বড় অংশের ক্ষত বহন করেছিল এই শহরটি।


সিরিয়ার ধ্বংসস্তুপ আলেপ্পো,সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

সিরিয়ার ধ্বংসস্তুপ আলেপ্পো। ছবি : দ্য টেলিগ্রাফ


 অথচ জেনে অবাক হতে হয়, বিশেষ কোনো স্থাপনা নয়, বরং গোটা আলেপ্পো শহরেরই ঠাঁই হয়েছিল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়। খ্রিস্টের জন্মেরও দুই হাজার বছর আগে এবং পালমাইরা শহরের পত্তনের আগে এটিই ছিল মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বিন্দু। আলেপ্পো এমন এক শহর যেখানে বিভিন্ন সভ্যতা, বিভিন্ন সমাজ ও সাংস্কৃতিক ভাবধারা, এমনকি বিভিন্ন ধর্ম এক বিন্দুত এসে মিশেছে। এই শহরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এরইমাঝে ধুলায় মিশে গিয়েছে। বিশেষ করে উল্লেখ করা চলে খ্রিস্টীয় ১১ শতকে নির্মিত আলেপ্পোর গ্রেট মসজিদের কথা। ২০১৩ সালেই আইএস হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় মসজিদটি।


সিরিয়ার ধ্বংসস্তুপ আলেপ্পো, সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

সিরিয়ার ধ্বংসস্তুপ আলেপ্পো। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স



প্রত্নতাত্ত্বিক শহর সামারা (ইরাক)

ইউনেস্কো একে বর্ণনা করেছিল, 'মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী টিকে থাকা একমাত্র ইসলামিক শহর। যেখানে স্থাপত্যশিল্প এবং শিল্প যেমন মোজাইক এবং খোঁদাইশিল্প একেবারেই মূল পরিকল্পনার অনুরূপ।' এই প্রত্নতাত্ত্বিক শহরের নাম সামারা। ইরাকে অবস্থিত এই শহরের গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল তা সঠিক জানা না গেলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলামী স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত আব্বাসীয় শাসনামলে এটি ছিল রাজধানী।


ইরাকের প্রত্নতাত্ত্বিক শহর সামারা, সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

ইরাকের প্রত্নতাত্ত্বিক শহর সামারা। ছবি : পিন্টারেস্ট


আধুনিক সামারা শহরটি বর্তমানে ইরাকের শিয়া-সুন্নী বিরোধের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যদিও বিরোধের সূচনা একদিনে নয়। বরং ইরাকে সংগঠিত যুদ্ধের পর থেকেই এই শহর নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। এরইমাঝে ২০১৪ সালে আইএসের অধিকারে চলে যায় শহরটি। যদিও ইরাকি সরকারের পরিচালিত বিমান আক্রমণের পর পিছু হটে যায় তারা। কিন্তু তাতে করেও শহরটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করা যায়নি।

দামেস্কাস (সিরিয়া)

সিরিয়ার এই রাজধানী শহরটিও মুক্তি পায়নি আগ্রাসনের হাত থেকে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন কিছু শহরের মাঝে একটি। এবং কিছু কিছু নিদর্শন থেকে জানা যায়, যীশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার বছর আগে থেকেই এই শহরটি বর্তমান ছিল।


দামেস্কাস।

দামেস্কাস। ছবি : দ্য ন্যাশনাল


 দামেস্কাস বা দামেস্ক শহরটি উমাইয়া খিলাফতের সময় রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং তখন থেকেই আরব সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী এই দামেস্কে ১২৫টি সংরক্ষিত নমুনা আছে, যার মাঝে উল্লেখ করা যায় উমাইয়া মসজিদের কথা। যা আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছু মসজিদের মাঝে অন্যতম। যদিও ২০১২ সাল থেকে চলমান যুদ্ধের সময় থেকেই সিরিয়া সরকার শহরের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক পরিশ্রম করে চলেছে। কিন্তু দামেস্ক পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় আর নেই।

বসরা (সিরিয়া)

ইসলামের ইতিহাসে সিরিয়ার এই বসরা নগরীর তাৎপর্য একেবারেই অন্যরকম। বাজেন্টাইন কিংবা উমাইয়া শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর বলেই না, বরং রোম শাসিত আরবাঞ্চলের রাজধানীও ছিল প্রাচীন বসরা শহর। এই শহরে এখনও খ্রিস্টীয় ২য় শতকে স্থাপিত রোমান থিয়েটারের নিদর্শন বর্তমান রয়েছে।


বসরা শহর, সিরিয়া, সিরিয়া ইরাক ঐতিহ্য

বসরা শহর, সিরিয়া। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


 

সিরিয়া গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই শহরের দখল নেয়া বিবাদমান পক্ষগুলোর জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। যার কারণে মূলত ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে শহরের সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। ২০১২ সাল থেকেই নিয়মিত এই শহরে বোম এবং শেল আছড়ে পড়ার ভয়ানক ভিডিও ইন্টারনেট জগতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এসময় শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী জিনিসের লুট হবার ঘটনাও উঠে এসেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী হলেও মানুষের ভেদাভেদেই হারিয়ে যাচ্ছে, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। কোন একদিন এইসব জনপদে বোমার শব্দ থেমে পর্যটকের ক্যামেরার শাটার পড়ার শব্দ হবে, আপাতত প্রার্থনা ওতটুকুই।  


জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম