কেউ যখন বিশ্বের সর্বাধিক সুন্দর জায়গাগুলো নিয়ে চিন্তা করে, তখন তার মনস্পটে সম্ভবত পাহাড়-পর্বত, প্রচুর গাছে ভরা জঙ্গল, অভিনব সমুদ্র সৈকত কিংবা মরুভূমির কথাই ভাবে। কারও তালিকায় বিস্তির্ণ লবনের মালভূমির কথা থাকবে, এমনটা আশা করা যায় না।
তবে, বিশ্বের এমন এক পর্যটন স্পট রয়েছে যা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে যেন এক স্বপ্নের মতো স্থান। ‘সালার ডে ইউনি’ হলো এমন এক জলাধার, যাকে বলা হয় ‘ঈশ্বরের দর্পণ’। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে আজ বলা হবে দক্ষিণ আমেরিকার এই বিস্ময়কর স্থানের গল্প।
মানুষ কী শূন্যে ভেসে বেড়াতে পারে? এমন চেষ্টা মানুষের বহুকালের হলেও এখনও সেই অর্থে সফল হতে পারেনি। তবে বলিভিয়ার ‘সালার ডে ইউনি’তে গেলে হয়তো সেই স্বপ্নও পূরণ হতে পারে। আক্ষরিক অর্থে না হলেও প্রকৃতির অনন্য বিস্ময়ের দেখা মিলবে এখানে। আকাশ সেখানে নেমে আসে পায়ের নিচে। সত্যিই যেন শূন্যে হাঁটার মতো অনুভূতি দেয় এই বিস্ময়কর স্থানটি।
সালার ডে ইউনি
সালার ডে ইউনি। ছবি : পিন্টারেস্ট
লেক মিনচিন’ নামে হাজার হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে বিশাল এক হ্রদ ছিল। মরু অঞ্চলীয় খরার কারণে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে এই হ্রদ। একসময় এই হ্রদ পুরোপুরি শুকিয়ে গিয়ে জন্ম দিল বিশাল এক মরুভূমির, যার ওপরের আবরণ পুরো ঢেকে গেল লবণে। আর এর মধ্যভাগে জমা হল লিথিয়াম। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর ৫০-৭০ ভাগ লিথিয়ামের মজুদ রয়েছে এই অঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সালার ডে ইউনি’তে প্রায় ১০ বিলিয়ন টন লবণ মজুদ রয়েছে। মূলত এটির পাশের আল্টিপ্লানো পাহাড়টিতে জমে থাকা পানি বের হবার কোন রাস্তা নেই। তাই এই পানিগুলো এই এলাকায় এসে জমা হয় এবং পানি বাস্পায়িত হলেও লবণ থেকে যায়। আর এই লবণের স্তর আর পানির অল্প স্তর মিলে সেখানে এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সালার ডে ইউনি। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
সর্ববৃহৎ আয়না
পৃথিবির সর্ববৃহৎ এই আয়না নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানান কিংবদন্তীও। এই যেমন কিংবদন্তীতে আছে, পাহাড়ের দৈত্য টুনাপাকে ছেড়ে দিয়ে তার পত্নী আরেকজন পাহাড়ের দৈত্যের সাথে ঘর বাঁধতে চলে যায়। মনের দু:খে টুনাপা যখন তার দুগ্ধপোষ্যকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন, তখন কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানির দুধের সাথে মিশে যায়; পরবর্তীতে তা শুকিয়ে গিয়ে বলিভিয়ার এই লবণাক্ত জলাধারের সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু, এই জলাধারের সৃষ্টির সাথে এই কিংবদন্তীতুল্য কাহিনীর কোন সংস্পর্শ নাই। এটি সৃষ্টি হয়েছিল আন্দেজ পর্বতমালার ভূমি উপরের দিকে উঠে যাওয়া থেকে। এই উপত্যকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৬৫৬ মিটার উঁচুতে। পানি উঁচু পাহাড়ের ধারে এসে কোথা দিয়ে বেরুবার পথ না পেয়ে এখানেই থমকে দাড়ায়।
সালার ডে ইউনি। ছবি : সংগৃহীত
এই জলাধারের ওপরের স্তরটি খুবই মসৃন এবং এর আলো প্রতিফলন ক্ষমতা খুব বেশি হওয়ার মহাকাশে চলমান স্যাটেলাইটগুলো এই চকচকে উপরিভাগে সিগন্যাল পাঠিয়ে ভূপৃষ্ঠ হতে উচ্চতা মাপার যন্ত্রের (altitude meter) ক্যালিব্রেশন ঠিক করে নেন!
সালার ডে ইউনি’র সৌন্দর্য যখন তখন উপভোগ করা যায় না। এর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হয় প্রকৃতির জন্য। কেননা রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এটি একটি বিস্তৃত শুভ্র মরুভূমি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তবে এক পশলা বৃষ্টি পড়ে যখন পুরো আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন এই অঞ্চল পরিণত হয় এক বিশাল আয়নায়। যে আয়নার প্রতিচ্ছবিতে পুরো আকাশ ধরা দেয় পায়ের নিচে।
সল্ট-ফ্ল্যাট
সমতলে লবণের আস্তরণ থাকার ফলে যাকে ইংরেজিতে ‘সল্ট-ফ্ল্যাট’ বলা হয়, স্থলভাগ পুরোটাই স্বচ্ছ আয়নায় রুপ নেয়। আন্দিজ পর্বতমালা খুব কাছে হওয়াতে এখান থেকে খালি চোখে আকাশকে অনেকটাই কাছে মনে হয়।
সালার ডে ইউনি'র লবনের স্তর। ছবি : উইকিপিডিয়া
প্রায় ১০,৫৮২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই আয়নার বিস্তৃতি। প্রকৃতির আজব খেয়ালে আকাশ এবং স্থল মিশে গিয়ে এক ধরনের বিভ্রম বা মায়ার সৃষ্টি করে। আর তাই এই স্থানে পর্যটকদের ছবি তোলার বেশ চাহিদা রয়েছে। তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে হলে অবশ্যই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে হবে।
এই লবণভূমির খুব কাছে গাড় গোলাপি পানির হ্রদ রয়েছে। ‘ডেনেইলাইলা সেলাইনা’ নামক একধরনের ছত্রাকের কারণেই মূলত হ্রদগুলোর রং গোলাপি হয়। এই হ্রদটি ফ্লেমিংগো পাখির প্রজননের অন্যতম স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।