শেফশেওয়েন : নীল রঙের চাদরে মোড়া অপরূপ এক শহর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : উত্তর মরক্কোর রিফ পর্বতমালার মধ্যযুগীয় নান্দনিক শহর শেফশেওয়েন

মরক্কোর শেফশেওয়েন (Chefchaouen)

নীলের রাজ্য 'ব্লু সিটি' খ্যাত শেফশেওয়েন; ছবি : সংগৃহীত


 নীল পদ্ম, নীল শাড়ি, নীল আকাশ কিংবা বেদনার নীল রঙ- নীল রঙটি যেনো মানুষের আবেগেরই এক রূপ। নীলের সাথে মানব মনের রয়েছে এক সুগভীর সম্পর্ক। আর তাইতো নীল রঙ ভালোবাসা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আর সে ভালোবাসা থেকে যদি গোটা এক শহরকেই নীল রঙে রাঙিয়ে দেয়া হয় তবে তা আরও বেশি মোহনীয় সৌন্দর্যের অবতারণা করে। এমনই নীল রঙের মায়ায় গড়া এক শহর হল মরক্কোর শেফশেওয়েন (Chefchaouen) । নীলের চাদরে ঢাকা ছোট্ট এই শহরটি তার নীল সৌন্দর্য আর নান্দনিকতার জন্য পর্যটক ও ফটোগ্রাফারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় একটি ডেসটিনেশন হয়ে উঠেছে। উত্তর মরক্কোর রীফ পর্বতমালার মধ্যযুগীয় ছোট একটি শহর শেফশেওয়েন।

এই শহরটার পুরোটা জুড়েই নীল রঙের ছড়াছড়ি। এই শহরের বাসিন্দারা পুরো শহরটিকে নীল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। ভালোবেসে তারা এই শহরকে ডাকেন মরক্কোর ‘নীল মুক্তো’ নামে। শেফশেওয়েনের বাড়ি, ঘর, দরজা, জানালা থেকে শুরু করে শহরের সবকিছুই নীল রঙে রাঙা। দেখলে মনে হয় যেনো বিশাল নীল আকাশ এই শহরে নেমে এসেছে। সাজানো-গোছানো এই শহরটির প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে আছে মুগ্ধতা। ইন্সট্রাগ্রাম আর পিন্টারেস্টের বদৌলতে নীল রঙা এই শহরটি পর্যটকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তাই অসংখ্য ভ্রমণপ্রেমী ও ফটোগ্রাফাররা সারা বছর জুড়ে এখানে ভিড় জমান। এই শহরের প্রতিটি জায়গাই ছবি তোলার জন্য একদম অতুলনীয়। যেখানেই দাঁড়াবেন সেখানেই চমৎকার ছবি আসবে।

আরও পড়ুন : ইতিহাস সমৃদ্ধ মরক্কোর দর্শনীয় স্থান

মরক্কোর শেফশেওয়েন (Chefchaouen)

পর্যটকদের মন রাঙাতে আদর্শ এক শহর এটি; ছবি : সংগৃহীত


 পাহাড় ঘেরা এই শেফশেওয়েন শহরকে নীল রঙে রাঙিয়ে দেয়ার পেছনে রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস। ১৪৭১ সালে গড়ে ওঠা এই শহরে একসময় নানান ধর্মের মানুষ একসাথে বাস করত। এরপর বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হতে থাকে । ১৯৩০-এর দশকে হিটলারের ভয়ে ইহুদিরা পালিয়ে এসে এই শহরে আশ্রয় নেয়। সেসময় এই ইহুদি শরণার্থীরা নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে পুরো শহরটাকে নীল রঙে রাঙিয়ে দেয়। তাদের কাছে নীল রঙের ছিল আলাদা মাহাত্ম। তাদের কাছে নীল ছিল আকাশ আর স্বর্গের প্রতীক। তাই স্বর্গের আকাশের সব নীলকে মর্ত্যে অবতারণা করাতেই তাদের এই চেষ্টা। ১৯৪৮ সালের দিকে বেশির ভাগ ইহুদিরা ইসরায়েল চলে গেলেও এই শহরের নীল রঙটি তেমনই রয়ে যায়।

আবার অনেকে বলেন, মশার হাত থেকে নিস্তার পেতে নাকি এই চেষ্টা। কারণ মশার দল নাকি টলটলে নীল জল দেখলে পালিয়ে যায়। আবার অনেক বাসিন্দারা বলেন, নীল রঙ তাদের ঘরগুলোকে পানির মতো ঠাণ্ডা রাখে। এখানকার লোকজন নীল রঙের এই ঐতিহ্যকে বছরের পর বছর ধরে রেখেছেন। প্রতি বছর বসন্তের সময় একবার করে পুরো শেফশেওয়েন শহরে নীলের প্রলেপ পড়ে। নীল রঙের পাউডার ও পেরিউঙ্কেল দিয়ে রাঙিয়ে দেয়া হয় এখানকার সব ঘর-বাড়িসহ সবকিছুকে । স্থানীয় সরকার এই পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাসিন্দাদের সব রকমের সহায়তা করে থাকেন।

আরও পড়ুন : নীল মসজিদ খ্যাত ইস্তানবুলের সুলতান আহমেদ মসজিদ : তুরস্ক


মরক্কোর শেফশেওয়েন (Chefchaouen)

কারুকার্য ময় নীলের মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে এখানে সর্বত্রই; ছবি : সংগৃহীত


 নীল রঙের বাড়ি ছাড়া এখানে তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণ না থাকলেও গোটা শহরটাই এই নীল রঙের জন্য অনন্য এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পাথরের ধাপ কেটে সরু সিঁড়িপথ, শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু রাস্তা, নীল রঙা ঘরের দেওয়ালগুলো শিল্পীর আঁকা ছবির মতো সুন্দর। দারুণ পরিপাটি করে সাজানো সকলের ঘর- বাড়ি। কোথাও আবার বাড়ির দেওয়ালে সুন্দর কারুকার্য চোখে পড়ে। বাড়িগুলোর সদর দরজায়ও কারুকার্য দেখা যায় কিন্তু তাদের জানালাগুলো বেশ ছোট। সূর্য যখন আকাশ জুড়ে তার সোনালি আলো ছড়িয়ে দেয় তখন শেফশেওয়েনের একপাশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠে আর আরেক পাশে তার ছায়া পড়ে চমৎকার সৌন্দর্যের অবতারণা করে।

নীল রঙের উপর এই আলো-ছায়ার খেলা এই শহরজুড়ে অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেয়। শেফশেওয়েনে সবচেয়ে বেশি নীলের আধিক্য দেখা যায় এর পুরনো ভাগে। সম্পূর্ণ নীলের চাদরে ঢাকা এই অংশটি পরিচিত মেদিনা নামে। নীল মেদিনা শহরের রাস্তা ধরে হাঁটলে মনে হবে আপনি বুঝি নীল সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছেন। এখানকার নীলে ঢাকা সরু অলি-গলি ঘুরতে গেলে অনেকটা গোলকধাঁধায় পড়ে যেতে হয়। তবে মেদিনার ঐতিহাসিক দুর্গটির মূল অংশ পাথুরে লালচে-কমলা রঙই রাখা হয়েছে। এছাড়া এর মসজিদের পাশের অংশটিও ঐতিহ্যগতভাবে সাদা। এই শহরে নীলের সঙ্গে কিছুটা গোলাপি, হলুদ আর সবুজ রঙের দেখা মিললেও নীলের এই রাজত্বে তাদের হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সংকীর্ণ পাশের রাস্তাগুলোর সড়কবাতির ছায়ায় এই শহরটিকে নীলকান্ত মণির মতোই অসাধারণ মনে হয়।

আরও পড়ুন : অটোমান সম্রাটদের রাজপ্রাসাদ টপকাপি প্রাসাদ, তুরস্ক


মরক্কোর শেফশেওয়েন (Chefchaouen)

এখানকার অধিবাসীদের জীবনধারাও বেশ উপভোগ্য পর্যটকদের নিকট ; ছবি : সংগৃহীত


 এই শেফশেওয়েন শহরে ৪০ হাজার লোকের বাস। যাদের বেশিরভাগই নীল রঙের কাপড় পরে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। এই শহরের মানুষের আচার-ব্যবহার, ঐতিহ্য ও খাবারেরও রয়েছে আলাদা সুনাম। এই শহরটি কোনও আধুনিক শহর নয়। পুরনো ঐতিহ্যকে ধারণ করেই এখানকার লোকজন তাদের জীবন-বৈচিত্র্য ধরে রেখেছে। এখানকার লোকজন শার্ট-প্যান্ট পরিধান করেন না, তারা পরেন “জাবেলা” নামের শীতের উপযোগী উলের তৈরি একধরনের আলখাল্লা। এই শহরে কোনও ফাস্টফুডের দোকান পাবেন না।

এখানে তাদের লোকাল সব খাবার-দাবার পাবেন। যার মধ্যে আছে হারিরা (টমেটো ডাল), তাজিন, তাঞ্জিয়া, কুসকুস ইত্যাদি। সকালের নাস্তায় পাবেন দারুণ মিষ্টি চা, অরেঞ্জ জুস, রুটি, মধু ও জ্যাম। অপার শান্তিময় এক শহর এটি। এখানে নেই কোন তাড়াহুড়া। এখানকার বাসিন্দারা অত্যন্ত সহিষ্ণু এবং অতিথিপরায়ন। অত্যন্ত নিরাপদ এই শহরে গভীর রাতেও নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ানো যায়। এই শহরকে উপভোগের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে হাঁটা। হেঁটে হেঁটে ছোট এই শহরের সব সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে পারবেন।

রাস্তায় রাস্তায় দেখা পাবেন আদুরে সব বিড়ালদের। কেনাকাটার জন্য এই শহরে আছে বিশ্ব বিখ্যাত চামড়ার ব্যাগ, মসলা, জাবেলা, কার্পেট, পেইন্টিং এবং নানান সুভ্যেনির। যারা একটু অ্যাডভেঞ্চার করতে চান তারা চলে যেতে পারেন আঁকছর লেকে হাইকিং করতে। নীল রঙের মায়াময় সব জায়গা, আতিথেয়তা ও প্রশান্তিময় বাতাবরণ-সব মিলিয়ে শেফশেওয়েন আপনাকে দেবে অসাধারণ এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

  রুবাইদা আক্তার   এস এম