বাঙালির গৌরবের স্মৃতিকে জ্বালিয়ে রাখা শিখা চিরন্তন : ঢাকা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মারক ও বাঙালির অহংকারের প্রতীক শিখা চিরন্তন



শিখা চিরন্তন Eternal Flame

ছবি : সংগৃহীত


বাঙালি জাতিসত্তার সাথে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতার সংগ্রাম। এর সাথে জড়ানো রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর বিজয়কে অম্লান রাখা আমাদের জাতিসত্তার অংশ। বাঙালির গৌরবময় এই ইতিহাস যুগের পর যুগ প্রেরণা যোগাবে সকল প্রজন্মকে। আর সেই গৌরবের স্মৃতিকে জ্বালিয়ে রেখেছে শিখা চিরন্তন (Eternal Flame)। রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এটি অবস্থিত। শিখা চিরন্তন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মারক ও বাঙালির অহংকারের প্রতীক। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যা সেসময় রেসকোর্স ময়দান ছিল, এখানে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান একে নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে এ উদ্যানেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে নি:শর্ত আত্মসমর্পণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণের ঘটনা। সেই ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের এই স্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়।

সে স্মৃতিকে জ্বালিয়ে রাখতেই দিন-রাত জ্বলছে এই অগ্নিশিখা। ১৯৯৬ সালে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিখা চিরন্তন প্রজ্বলন এর দেশব্যাপী শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। এই প্রজ্বলিত শিখা সারা ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ছুঁয়ে ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছায় । ওইদিন এটি স্থাপন করেন বিশ্বনন্দিত চার নেতা। দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, তুরস্কের সুলেমান ডেমিরেল ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই শিখা চিরন্তন আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। শিখা চিরন্তনের আশেপাশে টবে গাছ লাগানো হয়েছে। যা এখানকার পরিবেশকে আর সুন্দর করেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে এর পাশেই আছে স্বাধীনতা স্তম্ভ, গ্লাস টাওয়ার। যার উজ্জ্বল আলোকসজ্জা আর প্রজ্বলিত এই শিখা এই জায়গার সৌন্দর্যকে সন্ধ্যায় আরও মনোরম করে তোলে।

এছাড়া এর পাশে আছে ভূগর্ভস্থ জাদুঘর ও উন্মুক্ত মঞ্চ। শিখা চিরন্তনের পাশের ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরটিতে তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এই জাদুঘরটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার বাস্তব নিদর্শনকে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৪৪টি প্যানেলে এই আলোকচিত্রগুলো উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে টেরাকোটা, ঐতিহাসিক ছবি, যুদ্ধের ঘটনা সম্বলিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও দেখানো হচ্ছে। এছাড়াও স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিলিপি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশে প্রচারণা সৃষ্টিতে তৈরি করা বিভিন্ন পোস্টারও এই জাদুঘরটির রয়েছে। যা থেকে নতুন প্রজন্ম আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে আরও ভালভাবে জানতে পারবে। এখানে আরও আছে আমাদের দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনার ছবি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্লাজা চত্বরের পূর্ব পাশের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে ম্যুরাল।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের চিত্র এই টেরাকোটা ম্যুরালের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এই ম্যুরাল থেকে শিশুরা জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। আমাদের দেশের এই শিখা চিরন্তন আমাদের বিজয়ের গৌরব। বাঙালি জাতিসত্তার অমরতার প্রতীক 'শিখা চিরন্তন' এভাবেই জ্বলন্ত থেকে আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাসকে এভাবেই প্রজ্বলিত করে রাখছে।  


রুবাইদা আক্তার   এস এম