দেশে দেশে মৃতদেহ সৎকারের নানান রীতি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যতায় বিভিন্ন দেশের মৃতদেহ সৎকার

মৃত্যু সবসময়ই কষ্টের। আপনজনের মৃত্যু প্রকৃতির এক কঠিন সত্যের সাথে আমাদের পরিচয় করায়। মৃত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ও তাদের ইহজাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করতে প্রতি ধর্মেই নিজস্ব বিধি-বিধান দেয়া আছে। মৃত ব্যক্তির সৎকার হিসেবে আগুনে পোড়ানো বা কবর দেয়ার রীতি আমাদের খুবই পরিচিত।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে মৃতদেহ সৎকারের আরও নানারকম অদ্ভুত ও উদ্ভট প্রথা রয়েছে। আমাদের কাছে উদ্ভট মনে হলেও তারা তাদের প্রথা নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাকে। দেশে দেশে এসব অদ্ভুত সৎকার প্রথার সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে।

মৃতদেহকে সাথে নিয়ে নৃত্য, মাদাগাস্কার

মাদাগাস্কার

মাদাগাস্কারে মৃতদেহ নিয়ে নাচার প্রথা 'ফামাদিহানা' মেনে চলা হয়; ছবি : ব্লগ ডট সেভেন পাউন্ড ডট কম


মাদাগাস্কার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ দেশ। মারা যাওয়ার পরেও মৃতব্যক্তিরা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 'মৃতদেহকে নিয়ে নাচা'-মাদাগাস্কারের মৃতদেহ সৎকার মূল পরিচায়ক। তাদের এই রীতিকে 'ফামাদিহানা' বলা হয়ে থাকে। মৃতদেহ সৎকারের কয়েক বছর পর মৃতব্যক্তির দেহকে তারা কবর থেকে বের করে সেটিকে নতুন বস্ত্রে সজ্জিত করে। আর তারপর মৃতদেহকে ঘিরে নাচতে থাকে মাদাগাস্কারের মানুষ। মৃতদেহ যাতে দ্রুত পচে গিয়ে পরমাত্মার সাথে মিশে যেতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই এই রীতি।

মৃতদেহ যখন শকুনের খাবার, তিব্বত

তিব্বতে মৃতদেহদের পাহাড়ের ওপর রেখে আসা হয় শকুন বা অন্যান্য পাখির খাবার হিসেবে। প্রথাটি আমাদের কাছে ঘৃণ্য মনে হলেও তিব্বতীয়ানদের কাছে এর ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে জীবনের অনিত্য চেহারাকেই ফুটিয়ে তোলে এই রীতি। মৃতদেহটি এখন শুধুমাত্রই একটি জড় পদার্থ, দেহের ভেতরে থাকা আত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হয়েছে; তাই এই জড়দেহটি নিয়ে তারা দুঃখ বাড়ায় না। তিব্বতে মনে করা হয়, যদি শকুন বা অন্যান্য পাখিরা মৃতদেহটিকে পুরোপুরি খেয়ে ফেলে তবে তা শুভলক্ষণ, অন্যথায় মৃতব্যক্তির মোক্ষলাভ হবে না।

আরও পড়ুন : ডে অব দ্যা ডেড : মৃতদের প্রতি উৎসর্গকৃত ধর্মীয় এক উৎসব

বসে থাকা মৃতদেহ, ফিলিপাইন

বাড়ির মধ্যে কেউ মারা গেলে তাকে সৎকারের জন্য কোথাও নিয়ে যায় ফিলিপাইনের ইফুগাও অঞ্চলের বাসিন্দারা। মৃতদেহকে বাড়ির সামনে চেয়ারে বসিয়ে রাখে তারা। মৃতদেহ যাতে চেয়ার থেকে পড়ে না যায় সেজন্যে মৃতব্যক্তির হাত, পা আর মাথা চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখে তারা। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে যেন চেয়ারে কেউ বসে অবসর যাপন করছেন। মৃত ব্যক্তিকে এভাবে আটদিন চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়, আর তার মৃত্যুকে ঘিরে তার সামনে আটদিন ধরে চলে মজাদার খাবার খাওয়া, নাচ, গান আর হুল্লোড়।

পানিতে সৎকার

পানিতে সৎকার

অন্তিম যাত্রায় এভাবেই সাজানো নৌকায় ভাসিয়ে দেয়া হয় মৃতদেহ; ছবি : লাইফ ইন নরওয়ে


অনেক সংস্কৃতিতেই বিশেষ করে নর্ডিক দেশগুলোতে মৃতদেহকে পানিতে ভাসিয়ে অন্তিম সংস্কার করা হয়। পানিকে তারা সৎকারের জন্য মাটির মতোই ব্যবহার করে। নদী বা সমুদ্রের পানিতে কফিন ভাসিয়ে দেয় তারা। তাছাড়া অনেকে মৃতদেহকে নৌকোয় করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়, তাদের কাছে এ নৌকা 'ডেথ শিপ' নামে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করে সমুদ্রের পানিতে ভেসে ভেসে মৃতদেহের আত্মা সৃষ্টিকর্তার সাথে মিলিত হয়।

মৃতব্যক্তির দেহ যখন খাবার

ভেনেজুয়েলা আর ব্রাজিলের সীমারেখা বরাবর অ্যামাজনের অরণ্যে প্রাচীন ইয়ানোমামি সম্প্রদায়ের লোকজন মৃতব্যক্তির দেহ স্যুপ বানিয়ে খায়। তারা মনে করে মৃত্যু কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়, তাই মৃত্যুরূপ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা এই প্রথা পালন করে। কেউ মারা গেলে মৃত ব্যক্তিকে কাছের জঙ্গলে তারা ফেলে আসে ৪০-৫০ দিনের জন্যে। এসময়ের মধ্যে দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে তারা হাড়গুলো নিয়ে এসে আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম তৈরি করে। তারপর তারা ভস্ম থেকে একধরনের স্যুপ তৈরি করে। তারা মনে করে এভাবে মৃতব্যক্তির দেহ থেকে স্যুপ বানিয়ে খেলে মৃত ব্যক্তির আত্মা তাদের সাথেই থেকে যায় । 

 ইন্দিরা বিশ্বাস   এস এম


Click Here To See More