'শোলা হ্যায় ইয়া হ্যায় বিজুরিয়া, দিল কি বাজারিয়া, বম্বাই নাগারিয়া'— বাপ্পীদার কন্ঠে মোবাইলের প্লে লিস্টে এই গানটা অনবরত বেজে চলেছে। কোলকাতা বিমানবন্দরে সময়ের বেষ্টনী যেন ভাঙতে চায় না।
লক্ষ লক্ষ জীবনের বেষ্টনী আল্গা হয়েই তো সেই শহরটা আজও জীবন্ত হয়ে আছে খান, বচ্চন, কাপুরদের মাদকতায়।
সেই মাদকতার শহরে প্রথম যাত্রার টানটান উত্তেজনা যেন সব উচ্চতাকে ডিঙিয়ে চলেছে। ২০১৯ সালের এই যাত্রা নিছকই পারিবারিক হলেও ভ্রমণ-পিপাসুদের মন খুঁজে চলে এক অন্য দৃশ্যপট। কোলকাতা থেকে মুম্বাই নিয়ে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন দীপন দাস।
ভার্সোভা বীচ, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস
শুরুটা হয়েছিল নভি মুম্বাই থেকে। নতুন তৈরি হওয়া এই শহরটার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় কয়েক বছর আগের সল্টলেক কিংবা গুলশানকে। ছোট ছোট টিলা ভেঙে চলছে উন্নয়নের কান্ডারী।
মাঝে মাঝে আছে আধখেঁচড়া খাঁড়ি, যেখানে আবার এই আকালেও দেখা মেলে পরিযায়ী পাখিদের। সি-উড শপিং মল, পানভেলের সুদীর্ঘ স্কাই ওয়াক, নান্দনিক নভি মুম্বাই মহানগরপালিকা । এইরকম আরও অনেক কংক্রিটের আবর্জনার ফাঁকে হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া যায় এক টুকরো সবুজকে।
সবুজের তীর ধরেই এবারে উঠে পড়তে হয় 'মুম্বাই লোকাল'-এ। সময়ের আগে ঝনঝন গতিতে চলতে থাকা 'রেলগাড়ির কামরায়' কোনো প্রেয়সীর 'হঠাৎ দেখা' পাওয়া যায় কিনা জানি না ।
তবে কোটি কোটি মানুষের দিনযাপনের গল্পে যুগ-যুগের ইতিহাস লিখে চলেছে এই লোকালের সেই গতিময়তা, যা 'ঘুমহীন' মুম্বাইয়ের প্রধানতম অবলম্বনও বটে।
নভি মুম্বাইয়ের এক খাঁড়ি। ছবি : দীপন দাস
আর এই শহরের মানুষগুলোর মনের জোর ক্লান্তিহীন রাখতে যিনি অন্যতম অবলম্বন তিনি হলেন 'সিদ্ধিবিনায়ক গণপতি'। অনুষ্ঠান-সর্বস্বতার উর্ধ্বে উঠে এই মন্দির ভক্তির অকুল সাগরে অনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করে চলেছে।
কিছুটা দূরেই আছে ঐতিহ্যমণ্ডিত মহালক্ষী মন্দির। আর এই দুই পীঠস্থানের পাশ বেয়েই ভালো থাকার মন্ত্র পরে যাচ্ছে পীর হাজী আলীর পবিত্র দরগা। এভাবেই এক টুকরো ভারতবর্ষ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অনায়াসেই নিজের নিগূঢ়তম অস্তিত্ত্ব জানান দিয়ে চলেছে।
ভক্তির অস্তিত্ত্বে মাথানত করে প্রকৃতির কোল ঘেঁষে এবার হাল্কা হওয়ার পালা। কানে ভেসে আসে সেই সুতীব্র গর্জন যা ঢেউয়ের ঘাত-প্রতিঘাতে অবান্তর ইশারা দিয়ে চলে—'ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে, তোর নাম ধরে কেউ ডাকে'। নামটা জুহু চৌপট্টি। মানুষের প্রতারণায় সুন্দরের জয়গান এখানে ধীরে ধীরে মুলতুবি হতে লাগলেও প্রকৃতির অমোঘ খেয়াল বরাবরই শেষ কথা বলে।
জুহু চৌপট্টি, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস
তারপর, এক বিকেলে সূর্যের পড়ন্ত আভায় অন্য কথা বলে গেল ভার্সোভা সমুদ্রসৈকত। না, এখানে কোনও প্রতারণা নেই। আর তাই বসন্তের আনাগোনা ছাড়াই সেদিন 'নীলদিগন্তে' 'ফুলের আগুন' রিক্ত করে দিল একলা থাকার প্রতিটা মুহূর্তকে।
এর মাঝেই যদিও মূহুর্তরা সঙ্গে ছিল বান্দ্রা ফোর্টের অযথা রহস্যেও। সমুদ্রের ঢেউয়ে ক্লান্ত হওয়া বোল্ডারগুলোর অসহয়তায়, মুম্বাই-উয়র্লি ব্রীজের কৃত্রিমতা ভেদ করে, এই ফোর্টের আনাচে কানাচে জীবন্ত হয়ে উঠলো কোনও অজানা ইতিহাসের হাতছানি।
বান্দ্রা ফোর্টের ফলক, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস
এই রকম রহস্য বা হাতছানিতে মুগ্ধ করে বান্দ্রা রেলষ্টেশনও। ষ্টেশন থেকে ফোর্টে যাওয়ার রাস্তায় এক বাড়ির সামনে অগণিত মানুষের ভিড় চোখে পড়লো। তারপর বোঝা গেল, এই ভিড় আসলে 'মন্নত' পূরণের অপর নাম। কিছুটা পথ পেরিয়েই বিলাসবহুল তাজ হোটেল যেখানে the land ends।
তবে, অভিজ্ঞতার অসমাপ্ত ইতিকথায় চোখের পলকে এবার একটু ক্লান্তি নামে। সময় অল্প, দেখা অনেক বাকি। তবুও 'বিরামহীন' শহরটার বুক চিঁরে এবার তাই বিরামের দরকার। তবে কথা দিলাম, ফিরে আসবো মায়া নগরীর কোনো এক মায়াবী সন্ধ্যা কিংবা নিতান্তই বেঁচে থাকার কিছু শব্দের জলছবি নিয়ে।
বান্দ্রা ফোর্ট থেকে মুম্বাই-উয়র্লি সী লিংক। ছবি : দীপন দাস
পথ নির্দেশনা :
কোলকাতা থেকে মুম্বাই ট্রেন বা বিমানে যেতে হবে।
দক্ষিণ মুম্বাইয়ে বা বিমানবন্দরের আশেপাশে হোটেল পাওয়া যাবে। দাম একটু বেশি, আগে থেকে অনলাইন বুক করা যেতে পারে।
লোকাল ট্রেন-এর খুঁটিনাটি জানতে M-Indicator অ্যাপটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
জুহু চৌপট্টি, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস
সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরের নিকটবর্তী স্টেশন দাদরা। সেখান থেকে শেয়ারড ট্যাক্সি করে মন্দিরে যাওয়া যাবে। সিদ্ধিবিনায়ক থেকে মহালক্ষী বা হাজী আলী যাওয়ারও শেয়ারড ট্যাক্সি পাওয়া যায়। বান্দ্রা ফোর্ট বা মন্নত যেতে হলে বান্দ্রা স্টেশন থেকেই শেয়ারড ট্যাক্সি পাওয়া যাবে। জুহু চৌপট্টির নিকটতম স্টেশন ভিলে পার্লে। সব ক্ষেত্রেই মাথাপিছু ভাড়া ৩০-৫০ রুপি।
ভার্সোভা বিচ যেতে হলে অন্ধেরি রেল স্টেশনের এক প্রান্ত থেকে মেট্রো নিতে হবে। মেট্রো থেকে নেমে ১০-১৫ মিনিটের হাঁটা পথ।