আভিজাত্য এবং গৌরবে পরিপূর্ণ মসলিন কাপড়
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : গৌরবময় ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সফলতার দ্বারপ্রান্তে গবেষকরা
নজরকারা মিহি প্রাচীন মসলিন কাপড়। ছবি : কুওরা
বাংলাদেশের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি বরাবরই আভিজাত্য এবং গৌরবে পরিপূর্ণ। শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস কিংবা ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, লোকশিল্প, টেরাকোটা শিল্প প্রভৃতির মাঝেই নয় বস্ত্রের দিক থেকেও এর আভিজাত্য নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। এক সময় এখানে তৈরি মসলিন কাপড় ছিল পুরো পৃথিবী বিখ্যাত। কিন্তু কালের গর্ভে এই মসলিন কাপড় হারিয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি একদল গবেষক দীর্ঘ গবেষণার পরে হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে। শুধুমাত্র এদেশে বসবাসরত মানুষের জন্যেই নয়, তখনকার সময়ে এই মসলিন কাপড় এতটাই খ্যাতনামা ছিল যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে রপ্তানি করা হতো মসলিন কাপড়। বুননশৈলী এদেশ ছাড়া আর অন্য কোথাও সম্ভব ছিল না। মসলিন কাপড় এতটাই সূক্ষ্ম এবং মিহি ছিল যে বহু ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিকগণ তাদের লেখনীতে বারবার এর প্রশংসা করেছেন। তখনকার সময়ে অভিজাত মানুষদের একমাত্র পছন্দ ছিল মসলিন কাপড়। রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অভিজাত নারীরা মসলিন কাপড় পরতে খুবই পছন্দ করতেন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে 'পেরিপ্লাস অব দা অ্যারিথ্রিয়ান'-শীর্ষক গ্রন্থে মসলিন কাপড় সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে মসলিনের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে খুব সুন্দরভাবে বলা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ইতিহাসবিদ তাদের গ্রন্থে বিভিন্ন সময়ে মসলিন কাপড়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন যা সত্যিই অতুলনীয়।
সূক্ষ্ম মসলিন বুনন। ছবি : দ্যা ইনডিপেন্ডেন্ট
মসলিনের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হতো তখনকার সময়ের রোমান সুন্দরীরা দেহের বঙ্কিম রেখা প্রকাশ করার জন্য মসলিন কাপড় ব্যবহার করতেন। তাহলে বোঝা যাচ্ছে মসলিন কাপড় কতটা সুক্ষ্ম এবং নিপুণ বুননশৈলীতে তৈরি যে, দেহের বঙ্কিম রেখা কাপড় পরিধান করার পরেও বোঝা যেত। গ্রিক সুদর্শন যুবকরা 'ঝুনা' মসলিন কাপড় পরিধান করতে পছন্দ করতেন। দার্শনিকরা তাদের বিভিন্ন সময়ে ব্যঙ্গ করে তাদের লেখনীতে প্রকাশ করেছেন। একটি ঘটনা হতে জানা যায়, বিশিষ্ট সম্রাট বাদশাহ আওরঙ্গজেবের কন্যা শাহজাদী জেব উলেমা সাত প্যাঁচ আবরোয়া পরার পরও তার পিতা কর্তৃক তিরস্কৃত হয়েছিলেন। এ ঘটনাগুলো থেকে মসলিন কাপড়ের মিহি কাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। খ্রিস্টিয় নবম শতকে বিশিষ্ট লেখক সুলাইমান তাঁর একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন মসলিন কাপড় এতটাই সুক্ষ্ম ছিল যে ৪০ হাত লম্বা এবং দুই হাত চওড়া মসলিন কাপড় একটি ছোট আংটির মাঝ থেকে নেয়া যেত। এই বিষয়টি কল্পনা করতে এখন অনেকটাই অদ্ভুত লাগে।
ছবি : প্রথম আলো
খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা সোনারগাঁওয়ে উৎকৃষ্ট মানের মসলিন তৈরি হতে দেখেছিলেন। মসলিন কাপড়ের মিহি কাজ ইংরেজ কোম্পানির এক বিশেষ কর্তা রবার্ট ওরম ১৭৫০ সালে দেখেছিলেন। তিনি মসলিন কাপড় সম্পর্কে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, 'এমন অবিশ্বাস্য রকমের সূক্ষ্ম কাপড় কি করে যে এখানকার মানুষ তৈরি করতে পারে তা আমার কাছে একটি ধাঁধা। বিশেষ করে এই কারণে যে, এসব কাপড় তৈরি করতে যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয় তা থেকে এরা বঞ্চিত'। মূলত ইউরোপে কাপড় তৈরির পর বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ উপার্যন হত সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে মসলিন কাপড় বিক্রি করে তার থেকে ১০ গুণ অর্থ বেশি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা থেকে তাঁতিরা বঞ্চিত ছিল। সেকালে মসলিন তৈরির পাশাপাশি সস্তা বা মাঝারি মানের বস্ত্র তৈরি করা হতো। আর মসলিন কাপড় রপ্তানি করা হতো আগ্রা, লাহোর, মুলতান পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলে। মসলিন কাপড় তৈরির প্রাচীন কেন্দ্র ছিল ভাওয়াল অঞ্চলের কাপাসিয়া এলাকায়। মধ্য যুগের বিখ্যাত ঢাকাই মসলিন পাওয়া যেত প্রাচীন সোনারগাঁও-এ। আধুনিককালের মসলিন তৈরি হতো পদ্মা ও মেঘনা বেষ্টিত ১৯৬০ বর্গমাইল জুড়ে। মসলিন কাপড় তৈরির জন্য যে সুতা প্রয়োজন ছিল তা অন্য কোথাও থেকে আমদানি করা হতো না। তখনকার সময়ে মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে চাষ করা হতো বয়রাতি এবং ফুটি কার্পাস। বয়রাতি এবং ফুটি কার্পাস থেকেই যে তুলা পাওয়া যেত তা থেকে মসলিন কাপড় তৈরি হতো।
ফুটি কার্পাস গাছ। ছবি : সমকাল
মসলিন কাপড় তৈরির জন্য কয়েকটি ধাপ ছিল। ১৬ থেকে ৩০ বছর মেয়েরা তাদের হাতের নরম আঙ্গুলের সাহায্যে মিহি সুতা তৈরি করত। তারপর সেই সুতা থেকেই মসলিন কাপড় তৈরি হতো। ফুটি কার্পাস থেকে উন্নত মানের মসলিন কাপড় তৈরি করা হতো এবং বয়রাতি থেকে নিকৃষ্ট মানের মসলিন কাপড় তৈরি করা হতো। তুলা থেকে সুতা উৎপাদনের পর কয়েকটি পর্যায়ক্রমিক ধাপ ছিল। যেমন : নাটান, টানা হোতান, সানা বাঁধা, বু-বাঁধা। তারপর যে কাজগুলো করা হতো তা হলো : কাপড় ধোয়া, সুতা সু-বিন্যস্ত করা, রিপু করা, সুচের সূক্ষ্ম কাজ করা এবং সবশেষে গাঁটারি বাঁধা। প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা পেশাজীবী মানুষ ছিলেন যারা দক্ষতার সাথে তাদের কাজ সম্পাদন করতেন। বলা চলে, মসলিন কাপড় তৈরির সাথে বিভিন্ন জীবন ও জীবিকার মানুষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ইতিহাস থেকে প্রায় ১৫ ধরনের মসলিন কাপড় সম্পর্কে জানা যায়। সবচেয়ে সুক্ষ্ম মসলিন কাপড় বলা হত মলমল'কে। এটি বেশ দামি এবং দৃষ্টিনন্দন ছিল। এই কাপড় তৈরি করতে তাঁতিদের প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যেত। এই কাপড়গুলো সম্রাট এবং নবাবরা বেশি পরিধান করতেন। কথিত আছে মসলিন কাপড় এতটাই সুক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিন কাপড় একটি দেয়াশলাই বাক্সে সহজে রাখা যেত! ব্রিটেনের কার্পাস শিল্পের ইতিহাস প্রণেতা বেইন্সাক মসলিম সম্পর্কে বলেছিলেন, 'এগুলো কোনো পরী বা কীটপতঙ্গের বোনা। মানুষের দ্বারা এই বুনন অসম্ভব'।
ছবি : আওয়ার টাইম বিডি
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর মসলিন কাপড় হারিয়ে যাওয়া শুরু করে। ঊনবিংশ শতাব্দিতে মসলিন কাপড়ের ওপর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছিল। যেখানে ব্রিটেন থেকে আগত কাপড়ের ওপর ২ থেকে ৪ শতাংশ করারোপ করা হতো। এমনকি শাসকরা মসলিন কাপড় তৈরির জন্য নিয়োজিত তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল যেন তারা আর কখনও মসলিন কাপড় তৈরি করতে না পারেন। বর্তমানে 'মসলিন' নামক আধুনিক মিহি কাপড় বাজার দখল করলেও সেই সময়কালের আদি ও খাঁটি মসলিন কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে যা সত্যিই দুঃখজনক। বর্তমানে কিছুসংখ্যক সংরক্ষণশালাতে আজ এই কাপড়ের দেখা মেলে। তবে আশার বানী এই যে, সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চালানো কয়েক বছরের গবেষণার ফল এসেছে। গবেষকরা সেই মসলিন আবারও তৈরিতে সক্ষম হয়েছে।