ভ্রমণের গল্প বলা কালজয়ী ৫ বই

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : যুগে যুগে লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের ভ্রমণ করানো বই গুলো


বাস, ট্রেন অথবা বিমান, যে কোনো জায়গার ভ্রমণে বই দারুণ সঙ্গী। অজানার কথা জানাতে, নতুনের সাথে পরিচয় করাতে বইয়ের তুলনা হয় না। তবে, যারা ভ্রমণপ্রিয়, তাদের ভ্রমণের বইয়ের প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। যে জায়গায় যাচ্ছে সেটি সম্পর্কে জানতে, অথবা যে কোনো অজানা জায়গার নতুন গল্প পড়তে তারা বেশ পছন্দ করেন। যত নতুন জায়গা সম্পর্কে আপনি পড়বেন, তত তার সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাবে। ভ্রমণ নিয়ে অবশ্যই অনেক বই আছে, তবে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য কিছু ভ্রমণের বইয়ের পরামর্শ দিচ্ছি। হয়তো কাজে লাগতেও পারে।


দা আলকেমিস্ট

দা আলকেমিস্ট। ছবি : সংগৃহীত



দ্য অ্যালকেমিস্ট: পাওলো কোয়েলহো

স্বপ্নে দেখা গুপ্তধন খোঁজার উদ্দেশ্যে একদম শূন্য হাতে বের হয়ে সে পথেই জীবনসঙ্গীর সন্ধান মিলে যায় এমন গল্প আদতে আমরা কেউ চাইলেই বিশ্বাস করতে চাইব না হয়তো। ঠিক গল্পের মত শোনালেও, বইটি আসলে লেখা হয়েছে  আধ্যাত্মিক ও বাস্তব জীবনের উপলব্ধি নিয়ে। এই উপলব্ধিতে কোনো ভাবনা ভুল নয়, মিথ্যে নয়। বলছিলাম, ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর লেখা বিশ্বের অন্যতম বেস্ট সেলিং বই ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’। ১৯৮৮ সালে প্রথম ব্রাজিলে পর্তুগিজ ভাষায় প্রকাশিত হয়ে বেস্ট সেলিং এর তালিকায় না থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে সর্বোচ্চ বিক্রিত বইয়ের তালিকার মধ্যে স্থান করে নেয়। এখন পর্যন্ত ৬৭ ভাষায় অনূদিত হয়েছে বইটি। গল্পের মূল চরিত্র মেষপালক সান্তিয়াগো। তার প্রতিদিনের জীবনের গল্পের সাথে বাস্তব জীবন মিলে যায় অনেকখানি।


পাওলো কোয়েলহো

পাওলো কোয়েলহো। ছবি : সংগৃহীত


এই বইয়ে জীবনদর্শন উঠে এসেছে খুব সুন্দরভাবে। ‘যে কোনো স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় বাধা ভয়। স্বপ্ন পূরণের পথে বাধাগুলোও হয়তো ততটা বড় নয়, যতটা বড় সমস্যা ভয়।’ ‘সত্য যত কঠিন আর খারাপ হোক না কেন, তাকে গ্রহণ করা শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, যদি কোনো কিছু সত্যি হয়, তবে তা কখনোই অমলিন হবে না, হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না।’ গতানুগতিকতা থেকে বিরতি নিতে হবে। জীবনের গতানুতিক ধারা থেকে বের হতে হবে।’ এই বই নিজের ভেতর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অনুধাবন তৈরি করে।

অন দ্য রোড : জ্যাক কেওয়াক

‘অন দ্য রোড' পরিচিত বিট জেনারেশনের অন্যতম প্রামাণ্য উপন্যাস হিসেবে। ১৯৫১ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এই এক লাখ পঁচিশ হাজার শব্দের উপন্যাসটি শেষ করেন ২৯-বছর-বয়সী জ্যাক কেওয়াক। ১২০ ফুট লম্বা একটি ট্রেসিং পেপারের রোলকে সাইজ করে কেটে তার ওপর টাইপ করতে শুরু করেন কেওয়াক, পরে পাতাগুলো আবার জোড়া দিয়ে দেন।  ভাবগ্রস্তের মতো টাইপ করে গেছেন, মার্জিন, অনুচ্ছেদ, অধ্যায়, কিছুই রাখেননি। সঙ্গে ছিল শুধু কাপের পর কাঁপ কফি। বলা হয়, একজন বন্ধু এবং যাত্রাসঙ্গী নিল কাসাডি'র একটি চিঠি থেকেই নাকি কেওয়াকের বিশ্ববিখ্যাত এই উপন্যাসের সূত্রপাত। দুজনের ভবঘুরে বাউন্ডুলেপনার দিনগুলো তিনি ধরে রেখেছেন উপন্যাসের পাতায়।


অন দ্য রোড, জ্যাক কেওয়াক

অন দ্য রোড, জ্যাক কেওয়াক। ছবি : সংগৃহীত


এই বইতে ডিন মোরিয়ার্তি ও স্যাল প্যারাডাইস চরিত্র দুটির মধ্যে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ভ্রমণ ও রোমাঞ্চপ্রিয়তার বৈশিষ্ট্য। বইতে এই দুই চরিত্র স্যান ফ্রান্সিসকোয় অন্ধকারের উন্মোচন এবং বিস্মৃত স্থান আবিষ্কার, ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে অভিবাসীদের একটি শিবিরের সন্ধান পায়। এই বইতে যুদ্ধপরবর্তী ভিন্ন এক প্রজন্মের জীবনধারার স্পন্দন প্রতিফলিত হয়েছে বলে। ১৯৫৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। টাইম ম্যাগাজিনের ১৯২৩-২০০৫ সাল পর্যন্ত সেরা ১০০ ইংরেজি ভাষার বইয়ের তালিকায় স্থান ছিল এই বইয়ের।

দ্য সান অলসো রাইজেস : আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

প্যারিস থেকে পাম্পলোনার সান ফার্মিন উৎসবে ষাঁড়ের দৌড় ও ষাঁড়ের যুদ্ধ দেখতে যাওয়া একদল মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রবাসীদের গল্প নিয়ে রচিত বইয়ের নাম ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’। মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা বইটি প্রকাশিত হবার পর এটি নিয়ে মিশ্র পর্যালোচনা আসে। উপন্যাসটি প্রসিদ্ধ এর রচনাশৈলীর জন্য।



দ্য সান অলসো রাইজেস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

দ্য সান অলসো রাইজেস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


১৯২৫ সালে হেমিংওয়ের স্পেন ভ্রমণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো হয় এই উপন্যাসের প্লট। ১৯২৬ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। হেমিংওয়ের জীবনকারক জেফ্রি মায়েরসের মতে, ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ বইটি হেমিংওয়ের সেরা লেখাগুলোর একটি। আর হেমিংওয়ের সাহিত্য নিয়ে গবেষণাকারী লিন্ডা ওয়াগনার-মার্টিন এই বইটিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস’ বলে মনে করেন।

ইনটু দ্য ওয়াইল্ড : জন ক্রাকর

১৯৯২ সালের এপ্রিল মাস। আমেরিকার ইস্ট কোস্টের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ক্রিস্টোফার জনসন ম্যাক্যান্ডেলস গ্রাজুয়েশনের পর হাতে যে টাকা-পয়সা ছিল সব দাতব্য সংস্থায় দান করে দেয়। নিজের গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে, আইডেন্টিটি কার্ড, ক্রেডিট-ডেবিট সব ধরনের কার্ড পুড়িয়ে ফেলে, এমনকি নিজের সব জামাকাপড়ও ফেলে সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ হিসেবে হাঁটা শুরু করে উত্তর আমেরিকার পথে পথে। পরিবার জানতেন না এ গল্প। ছেলের মৃত্যুর পর আলাস্কার এক জনমানবহীন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত বাসে ক্রিস্টোফারের মৃতদেহ পাওয়া যায়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ার মাত্র চার মাসের মধ্যে অসংখ্য মানুষের সাহচর্যে এসেছে সে, মুগ্ধ করেছে সবাইকে। কারো ভালবাসার বন্ধনে আটকে না থেকে নিজের জীবনকে উপভোগ করেছে নিজের মত করে।


ইনটু দ্য ওয়াইল্ড, জন ক্রাকর, বই (ডানে), চলচ্চিত্র (বামে)

ইনটু দ্য ওয়াইল্ড, জন ক্রাকর, বই (ডানে), চলচ্চিত্র (বামে)। ছবি : সংগৃহীত


ক্রিস্টোফারের রহস্যময় সে ভ্রমণ জীবনের গল্প নিয়ে লিখেছেন জন ক্রাকর। তার সহকর্মী ছিলেন ক্রিস্টোফার। লেখক বইটি লিখতে ছুটে বেড়িয়েছেন গোটা উত্তর আমেরিকাজুড়ে। নিখুঁতভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন ক্রিস কীভাবে চারমাস কাটিয়েছে। চমৎকার ভাষাসহ অনেকগুলো ম্যাপ দিয়ে পাঠকের চোখের সামনে ক্রিসের ভ্রমণ করা জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছেন লেখক। এই বইটি ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সালে এই বইকে উপজীব্য করে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ইনটু দ্য ওয়াইল্ড’ সেরা বিক্রিত বইগুলোর একটি। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৪টি ভাষায়, সংস্করণ রয়েছে ১৭৩টি।


ট্রাভেলস উইথ চার্লি, জন স্টেইনবেক

ট্রাভেলস উইথ চার্লি, জন স্টেইনবেক (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত


ট্রাভেলস উইথ চার্লি : জন স্টেইনবেক

১৯৬০ সালে পোষা কুকুর চার্লিকে নিয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখিত গল্প ‘ট্রাভেলস উইথ চার্লি’। চার্লিকে সঙ্গে নিয়ে পিকআপ ট্রাক আর ঘোড়ার পিঠে চেপে আমেরিকার সড়কে লেখকের ১০ হাজারেরও বেশি মাইল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে বইটিতে। স্টেইনবেক বলেছিলেন, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজের দেশকে দেখার মানসে তিনি চার্লিকে নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। বইটিতে তত্কালীন ‘নতুন আমেরিকা’ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশও করেছিলেন লেখক। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় বইটি।  

নাবিলা বুশরা   এস এম