বার্লিনের দর্শনীয় সাত দিক
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বার্লিনের দর্শনীয় সাত দিক
ইতিহাস ও স্থাপত্যের দেশ জার্মানি
জার্মানি বলতেই আমাদের সামনে বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা আর কঠিন মুখের এডলফ হিটলারের কথাই যেন মাথায় আসে। সেই সাথে অবশ্য আরেকটি বিষয় মাথায় আসে, বার্লিন প্রাচীর। একটি দেয়াল, যা একই দেশকে দুই ভাগে ভাগ করেছিল। কালের সাক্ষী হয়ে জার্মান ঔদ্ধত্য স্তিমিত করেছিল অনেকটা দিন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিবেচনায় ইউরোপের অন্যসব বড় শহর যেমন লন্ডন, প্যারিস বা রোমের মতই অসাধারণ শহর বার্লিন। সেই বার্লিন, যেখানে হিটলারের রাজধানী ছিল, পৃথিবী বদলের পরিকল্পনা হতো। সেই বার্লিন, যেখানে ২য় বিশ্বযুদ্ধের মূল চরিত্র হিটলারের জীবনাবসান হয়েছিল। ইউরোপে যদি ঘুরতে যান, কিংবা যদি কখনও ইউরোপে থিতু হয়ে থাকেন, জার্মানির রাজধানী বার্লিনের বেশ কিছু জায়গায় আপনি অবশ্যই যেতে চাইবেন।
ব্রান্ডেনবার্গ গেট
ছবিতে ব্রান্ডেনবার্গ গেট দেখেননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। নিঃসন্দেহে এটি বার্লিনের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান। এক সময় পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির বিভেদের প্রতীক এই স্থাপনা বর্তমানে জার্মান একতা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই গেটটি ১৭৮৮ সালে রাজা দ্বিতীয় উইলহেমের সময়ে নির্মাণ করা হয়। পুরো গেটটি নির্মাণ করা হয় অ্যাথেন্সের দূর্গ প্রপেলিয়ার অনুকরণে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে এই ব্রান্ডেনবার্গ গেট বার্লিন প্রাচীরের একটি অংশ হয়ে পড়ে এবং পশ্চিম জার্মানি একে নিজেদের একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত করে তোলে। ১৯৮৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ড রোনাল্ড রিগ্যান সোভিয়েত রাশিয়ার নেতা মিখাইল গর্ভাচেবকে এই গেটের কাছে দাঁড়িয়েই বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার অনুরোধ করেন। যা এই গেটের স্মৃতির পাল্লা আরও অনেক বেশি ভারী করে ফেলে। রাতের বেলায় ২৬ মিটার উঁচু এই ব্রান্ডেনবার্গ গেট নিজেকে অসাধারণ রূপে মেলে ধরে। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র এই গেটটিই।
নতুন রাইখস্টাগ
১৮৯৪ সালে জার্মান শাসকদের স্থায়ী নিবাস হিসেবে নির্মাণ করা হয় রাইখস্টাগ প্যালেস। স্বাধীন সার্বভৌম জার্মানির প্রতীক ছিল এই ভবনটি। ১৯৩৩ সালে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবার আগে পর্যন্ত জার্মান শাসকগণ এখান থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করতেন। তবে বিশ্বযুদ্ধ এবং জার্মানির বিভক্তির কারণে এই ভবনটি আর ব্যবহার করা হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একীভূত হবার পর প্রায় ১০ বছরের সংস্কার কাজ শেষে 'রিবিল্ড রাইখস্টাগ' হিসেবে পরিচিতি পায় এই ভবনটি। ১৯৯৯ সাল থেকে রাইখস্টাগ ভবনে জার্মানির সাংসদীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পুনর্নিমিত এই রাইখস্টাগ ভবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর গম্বুজটি। কুপেল নামের এই গম্বুজ থেকে পুরো শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, বিশেষত রাতের বেলায়।
মিউজিয়াম আইল্যান্ড
স্প্রি নদী এবং কুপফারবার্গেনের মাঝে অবস্থিত স্প্রি আইল্যান্ড পর্যটকদের কাছে মিউজিয়াম আইল্যান্ড নামেই বেশি পরিচিত। পুরো জায়গাটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবেও ঘোষণা দিয়েছে। আপনি যদি জার্মানি এবং বার্লিন নিয়ে জানতে চান, কিংবা অতীতের জার্মানি বর্তমানে খুঁজে পেতে চান তবে মিউজিয়াম আইল্যান্ড আপনার জন্যে আদর্শ স্থান। এখানে একইসাথে আপনি বেশ কিছু জাদুঘর একসাথে পাবেন। পুরাতন জাদুঘর যা ১৮৩০ সালে তৈরি, সেখানে পাবেন জার্মান রাজাদের ইতিহাস আর ব্যবহার্য সবকিছু। ২য় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া নতুন জাদুঘর যা ২০০৯ সালে আবার খুলে দেয়া হয় তাতে বিভিন্ন অ্যান্টিক, মিশরীয় ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধান পাবেন। সেই সাথে আছে প্যাপিরাসের এক দূর্লভ সংগ্রহ। এছাড়া ন্যাশনাল গ্যালারিতে পাবেন অসামান্য সব চিত্রকর্ম। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় প্যারগামন জাদুঘরে আছে ইসলামী ইতিহাসের বিরল সংগ্রহ।
বার্লিন ওয়াল মেমোরিয়াল
ঘুরতে এসে বার্লিন ওয়াল দেখতে না পারা একরকম দূর্ভাগ্য। অসংখ্য স্মৃতি বিজরিত এই দেয়ালটি নির্মিত হয় ১৯৬১ সালে। প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দেয়ালটির বর্তমানে অবশিষ্ট আছে মাত্র ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার। বিভিন্ন রকম গ্রাফিতির উপস্থিতি এই দেয়ালটিকে পর্যটকদের কাছে অন্যরকম আবেদন এনে দেয়। এই মেমোরিয়ালে যুক্ত আছে মেরিনফেল্ড রিফিউজি মেমোরিয়াল, যা পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়া শরনার্থীদের স্মরণে তৈরি। এছাড়াও আছে গান্টার লিফটিন মেমোরিয়াল, যা পূর্ব থেকে পশ্চিম জার্মানিতে পালাতে যাবার সময় প্রথম নিহত ব্যাক্তির স্মরণে নামকরণ করা হয়েছে। এটি মূলত একটি ওয়াচ টাওয়ার, যা থেকে প্রাচীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হতো।
জার্মান হিস্ট্রিকাল মিউজিয়াম
বার্লিন শহরের ৭৫০ বছর পূর্তিতে ১৯৮৭ সালে নির্মাণ করা হয় জার্মান হিস্ট্রিকাল মিউজিয়াম। যারা জার্মান জাতির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান তাদের কাছে এটি অবশ্যই দেখে আসার মত একটি স্থান। জার্মান জাতির মোটামুটি সবকিছুই এই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। চিকিৎসা, ধর্ম, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি থেকে শুরু করে ২য় বিশ্বযুদ্ধ সংক্রান্ত এক বিশাল সংগ্রহ আছে এই জাদুঘরে। আর পর্যাপ্ত গাইডের উপস্থিতি থাকায় বিশাল এই জাদুঘরে আপনার ভ্রমণ খুব বেশি কষ্টকর হবেনা। সেই সাথে বিশ্রামের জন্যও সুযোগ আছে এই জাদুঘরে।বার্লিন টেলিভিশন টাওয়ার

২০২০ সালেই ৫০ বছরে পা রাখা বার্লিন টেলিভিশন টাওয়ার শহরের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। মোট ৩৬৮ মিটার উচ্চতা নিয়ে পুরো ইউরোপেই এটি ৩য় স্থানে রয়েছে। ১৯৭০ সালে স্থাপিত এই টাওয়ারে এখন পর্যন্ত ৬০ মিলিয়ন পর্যটক এসেছেন। মুগ্ধ হয়েছেন এর অসাধারণ নির্মাণশৈলীতে। বার্লিন শহরের সবচেয়ে সুন্দর রূপ দেখতে চাইলে আপনাকে এই টেলিভিশন টাওারে আসতে হবে। তৎকালীন পূর্ব বার্লিনের বুকে নির্মিত এই টেলিভিশন টাওয়ার ব্রান্ডেনবার্ফ গেটের মতই দুই জার্মানির মিলিত স্মারক হিসেবে পরিচিত। এর ২০৭ তলায় থাকা রেস্টুরেন্টে আপনি পাবেন জার্মান সংস্কৃতির নিজস্ব খাবার।
মেমোরিয়াল অফ মার্ডারড জুয়িশ অফ ইউরোপ
২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নৃশংস আচরণের কেন্দ্রে ছিল ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা। তাদের উপর ব্যাপক পরিমাণে নির্যাতন চালায় হিটলারের নাজি বাহিনী। হত্যাযজ্ঞে নিহত সেসব ইহুদীদের স্মরণেই নির্মিত হয়েছে এই মেমোরিয়ালটি। প্রায় ১৯ হাজার বর্গ মিটার জায়গায় ২৭১১ টি কনক্রিটের কবর রয়েছে। প্রতিটি কবরের সাথেই নিহতদের চিঠি, ডায়েরি এবং ছবিসহ যাবতীয় তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। বার্লিনে এইকটি স্থাপনা ছাড়াও অসাধারণ আরো অনেক নিদর্শনই আছে। বিশেষ করে বার্লিন ক্যাথেড্রাল চার্চ, টপোগ্রাফি অফ টেরর, বটানিক্যাল মিউজিয়াম, জুলোজ্যিকাল গার্ডেন এবং পৃথিবী বিখ্যাত গেন্ডারমেনমার্ক স্কয়ারেও চাইলে আপনি ঘুরে আসতে পারেন। যা আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য একেবারেই আদর্শ।
জুবায়ের আহম্মেদ এস এম
আরো পড়ুন ঃ ফ্লাওয়ার টানেল : বিশ্বের চোখজুড়ানো সব সুড়ঙ্গ
