অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বরিশাল; ছবি : ভ্রমণকারী
২০১৫ সালে স্কুল বন্ধুদের সাথে প্রথম যখন কুয়াকাটা ভ্রমণে গিয়েছিলাম তারপর থেকেই এক অন্যরকম ভালবাসা জমে যায় এই সাগরকন্যার সাথে। ভ্রমণে আমি সবসময় কোলাহলমুক্ত জায়গাগুলোই পছন্দ করি। কুয়াকাটা সে রকমই একটা জায়গা। তাই হয়তো এই জায়গাটা আমার এতটা পছন্দের। ২০১৫ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত দশবার এই জায়গাটায় ভ্রমণ করেছি। কখনও একা একা আবার কখনওবা সঙ্গীদের নিয়ে গিয়েছি।
সর্বশেষ গিয়েছিলাম গত বছরের সেপ্টেম্বরে। সেটাও আকস্মিকভাবে। সে সময়ে যাবার প্লান ছিল বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠির জেলার ভিমরুলি ভাসমান পেয়েরা বাজার, বায়তুল আমান জামে মসজিদ বা গুঠিয়া মসজিদ, দুর্গাসাগর এসব জায়গায়। অফিস স্বাভাবিকভাবে সপ্তাহে দুদিন ছুটি থাকে। এবার আমি একাই যাবার প্লান করেছিলাম। কিন্তু হুট করে বৃহস্পতিবার দুপুরে আমার সাথে আরও তিনজন যোগ হয়ে গেল।
অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় এসে রেডি হয়েই কমলাপুরের উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরলাম। সেদিন বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দূরত্ব মনে হলো অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ৩০ মিনিটের রাস্তা বেড়ে দেড় ঘণ্টায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাত্রার শুরুতেই এমন বিপত্তিকর পরিস্থিতিতে পড়াতে লঞ্চঘাটে যেতে যেতে দেরী হয়ে গেল। কোনো মতো দৌড়ে শেষ লঞ্চটায় উঠতে পেরেছিলাম।
এরপরই আমাদের এডভেঞ্চারের শুরু। লঞ্চ যখন বরিশালে ঘাঁটে পৌঁছলো তখন সকাল ৬টা বাজে। বরিশালে আমার এক ছোট ভাইকেও শুক্রবার সকালে সাথে নিলাম। তার নাকি আমার সাথে ভ্রমণ করার খুব শখ। এসব শখ পূরণ করতে আমার কোন আপত্তি নেই। তাই বরিশালে নেমে সকালের নাস্তা করতে করতে সেও এসে হাজির। এবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো।
ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান; ছবি : লেখক
বাসে করে প্রথমে ঝালকাঠি বাসস্ট্যান্ড নামলাম। নেমেই ইজি বাইক ঠিক করলাম। ভাসমান পেয়ারা বাজারে যাবো। যাবার পথে কীর্তিপাশা জমিদারি বাড়িও দেখা হয়ে গেলো। জমিদার আমলের এসব বাড়ি দেখলেই মনে হয় এতো সুন্দর কারুকার্য কীভাবে করতো সে সময়ে।
ঘণ্টাখানিক সেখানে থাকার পর চলে যাই ভাসমান পেয়ারা বাজারে। এই জায়গাটা ছবির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এতো সুন্দর জায়গা যে আমাদের দেশে থাকতে পারে সেটা আমার বিশ্বাসই হতোনা। এখানে যাবার আগে কতো যে ছবি দেখেছি তার হিসেব আমার নেই।
পেয়েরা বাজারে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে দুপুর পর্যন্ত ঘুরেছি আর মনের ইচ্ছেমতো পেয়েরা খেয়েছি । বোনাস হিসেবে পেয়েছি আমড়া ও আখ। শুধু খেয়েছি বললে ভুল হবে। পেয়ারা সাথে করে নিয়েও এসেছি। একমণ পেয়ারা যদি ২০০/৩০০ টাকা মূল্য হয় তাহলে আপনি না নিলেই বরং আপনার মন বেশি খারাপ হবে। এরপর জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য সেখান থেকে সোজা চলে যাই বায়তুল আমান জামে মসজিদ।
বরিশালের গুঠিয়ায় এই মসজিদের অবস্থান দেখে একে এখন সবাই গুঠিয়া মসজিদ হিসেবেই চিনে। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর মসজিদ এটি। এই মসজিদের খতিবও পিএইচডি করা। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গুঠিয়া মসজিদই এখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের জন্য সেরা নিদর্শন। সেখানে নামাজ শেষে গুঠিয়ার বিখ্যাত মিষ্টি খেয়ে রওনা হই দুর্গসাগরের উদ্দেশ্যে।
এরপর দুর্গাসাগর সারাদিন ঘুরে আমরা প্লান করেছিলাম সেদিনই সন্ধ্যায়ই ঢাকা ফিরে আসবো। কিন্তু আমার গ্রুপের অনেকেই কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত দেখেনি। তারা যখন বললো তীরে এসে কেউ তরী ডোবাতে চায়না। সেই সন্ধ্যায়ই আমরা বাসে করে বরিশাল থেকে চলে যাই সোজা কুয়াকাটায়।
নান্দনিক কুয়াকাটা; ছবি : এম জি এম ভিকি
বরিশাল থেকে যে ছোট ভাইকে নিয়েছিলাম তার নাকি কখনও সমুদ্রসৈকতই দেখা হয়নি। তাই সে অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল। তাকে দেখে আমার ভীষণ ভাল লেগেছিল। সমুদ্র দর্শনের পর তার যে অনুভূতিটা ছিল তা সত্যিই আমাকে এখনও অবাক করে।
সেদিন রাতটা আমরা কুয়াকাটায় কাটাই। দিনের বেলা কুয়াকাটার অপার সৌন্দর্য অবলোকন করি। বৃষ্টি সেদিন আমাদের বাধা দিতে চেষ্টা করলেও আমরা হাল ছাড়িনি। সেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই আমরা সমুদ্রস্নান করেছি। আর সাথে সাইটসিয়িং তো ছিলোই। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে শনিবার বিকালে পটুয়াখালী লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করি। রবিবার সকালে আমরা ঢাকায় পৌঁছে যাই।
সেদিনই এসে অফিস করতে হয়েছিল। হয়তো সেদিন ভ্রমণের ক্লান্তির ছাপটা চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল। কিন্তু প্রায় বছর হতে যাওয়া সেই ভ্রমণ কাহিনী আমার কাছে এখনও অক্ষত। আমি জানি আমার সাথে যারা ছিলো তারাও কখনও এই ভ্রমণের কথা ভুলবেনা। দৃষ্টিসীমায় জলরাশি, উদীয়মান বা অস্তমিতপ্রায় সূর্য লাল আভার মুগ্ধতা, ভাসমান মানুষদের জীবনযাত্রা, দৃষ্টিনন্দন মসজিদের অপরূপ কারুকার্য এসবই উজ্জীবিত করুক আমাদের মন ও মানসিকতা। অক্ষত হয়ে থাক বরিশাল বিভাগের অপার সৌন্দর্য।