চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নওদা বুরুজ বা ষাঁড়বুরুজ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর মোহনায় অবস্থিত নওদা বুরুজ

-Naoda_Buruz_নওদা বুরুজ বা ষাঁড়বুরুজ

ছবি : উইকিপিডিয়া


আমের দেশ হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। ভারত বিভাগের পূর্বে এটি মালদহ জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন নবাবগঞ্জকে ২০০১ সালের পহেলা আগস্ট সরকারিভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামকরণ করা হয়। প্রাচীন এই জনপদ সব সময়ই স্বাধীনতাকামী এবং শোষণ-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। নীল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সাঁওতাল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সহ প্রতিটা আন্দোলন সংগ্রামেই এই জনপদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। এই অঞ্চলের নানান প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এর শতবর্ষী ইতিহাস এখনও বুকে ধরে রেখেছে। যা পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তেমনই একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নওদা বুরুজ বা ষাঁড়বুরুজ।

স্থানীয়ভাবে ষাঁড়বুরুজ নামে পরিচিত এই স্থানটি প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ও লুকায়িত ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থান। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরের নওদায় অবস্থিত। রহনপুর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রাচীনকাল থেকেই এটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন : বাবু ডাইং বনভূমি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে ২৮ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত। এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পুনর্ভবা নদী। মহানন্দা ও পুনর্ভবার মিলনস্থানের নিকটেই নওদা বুরুজ অবস্থিত। পূর্বে পুনর্ভবা যদিও নওদা বুরুজের একদম পাশ দিয়েই বয়ে গেছিলো।

কি কি দেখতে পাবেন

রহনপুর রেল স্টেশনের ঠিক উত্তরে এক কিলোমিটার গেলেই বেশ কিছু পাশাপাশি উঁচু ঢিবি নজরে পড়ে। এই ঢিবিগুলোর নিচেই চাপা পড়ে আছে শত বছর পূর্বের ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এক গল্প। এখানে ঢাকা পড়ে আছে রাজা লক্ষণ সেনের বিশাল অট্টালিকা বা বালাখানা। ঢিবির উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার। এখানে মোট ছোট বড় মিলিয়ে ৪টা ঢিবি। প্রাচীন ইট আর প্রত্ন সম্পদে ঢিবিগুলো ভরে আছে বলে অনেকেই ধারনা করে থাকেন। দুর্বৃত্তরা প্রায়ই এখান থেকে ইট তুলে নিয়ে যায় এবং মাটি খুঁড়ে প্রত্নসম্পদ খোঁজার চেষ্টা করে। বিভিন্ন সময়ই এই নওদা বুরুজ খোঁড়ার কার্য চললেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা আর হয় নি।

১৯৬৪ সালে এখানে তৎকালীন নবাবগঞ্জ মহকুমা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে খনন করে কিছু প্রত্ন নিদর্শন উদ্ধার করা হয়। বেশ কিছু বৌদ্ধ মূর্তি, গণেশ মূর্তি এবং আরবি অক্ষর খোদিত মুদ্রাও সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া পূর্বে এ স্থান হতে বিষ্ণু, সূর্য এবং শিব দেব দেবীর মূর্তি আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তীতে সেগুলোর অবস্থান আর জানা যায় না।

আরও পড়ুন : এক নজরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ

ঢিবির মাঝে বিলীন এই ষাঁড়বুরুজ নামে খ্যাত অট্টালিকার আসল নাম ছিলও শাহ্‌ বুরুজ। শাহ্‌ অর্থ বাদশা এবং বুরুজ অর্থ অট্টালিকা অর্থাৎ বাদশাহ'র অট্টালিকা যা লোকমুখে বিকৃত হয়ে ষাঁড়বুরুজ পরিচিতি পায়। এই ষাঁড়বুরুজ এলাকা ছাড়াও রহনপুরের এলাকাতে প্রাচীন নগরের বিভিন্ন চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। গবেষকেরা নওদা বুরুজকে বৌদ্ধ স্তূপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইতিহাসবিদদের ধারণা মতে, রহনপুর প্রাক মুসলিম যুগের উন্নত একটি নগরী ছিল।

অযত্ন-অবহেলায় থাকা এই নওদা বুরুজ যে তাঁর গর্ভে অনেক ইতিহাসের ভাণ্ডার জমা রেখেছেন সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ছোট সোনা মসজিদ পার্ক, তোহাখানা, শাহ নেয়ামতুল্লাহ এর মাজার, চামচিকা মসজিদ, দারাসবাড়ি মসজিদ, ধানিয়াচক মসজিদ, স্বপ্নপল্লী, নাচোল রাজবাড়ী, বাবুডাইং, রহনপুর নওদা বুরুজ, গোয়াইন বাধ ৭টি, নীলকুঠি, মহানন্দা নদী, শুড়লার, তেঁতুল গাছ, স্বপ্ন পল্লী পার্ক, টাংঘন পিকনিক পার্ক, কানসাটের জমিদার বাড়ি।

সাখাওয়াত হোসেন   এস এম 


Click Here To See More