সৌন্দর্যখ্যাত দার্জিলিং-এর মনোরম পরিবেশের বাতাসিয়া লুপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : স্বর্গরাজ্য নামে পরিচিত এই লুপ

দার্জিলিংয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, বাতাসিয়া লুপ। ছবি : নর্থ বেঙ্গল ট্যুরিজম

দার্জিলিং গিয়েছেন অথচ বাতাসিয়া লুপে যাননি এরকম ভ্রমণপ্রেমীর সংখ্যা নেহায়ত খুব কম। দার্জিলিংয়ের এক নয়নাভিরাম দৃশ্য এখানে উপভোগ করা যায় যা কতটা অসাধারণ তা নিজের চোখে না দেখলে ধারণা করাটা কঠিন। দার্জিলিংয়ের বিখ্যাত টয় ট্রেনে বসে গেলে বাতাসিয়া লুপে আপনাকে আসতেই হবে।হিল কার্ট রোডে অবস্থিত বাতাসিয়া লুপ  দার্জিলিংয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। শহর থেকে দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটারের।

ট্যাক্সিতে করে সময় লাগবে মাত্র ২০মিনিট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ৭০০ ফুট উঁচুতে দার্জিলিং শহরটি। তাই বাতাসিয়া লুপ এবং রেলস্টেশন বা রেল লাইনও অনেক উপরে। এটি ভারতীয় রেলের সর্বোচ্চ রেল স্টেশন। বাতাসিয়া অর্থ বাতাসের জায়গা। লুপ মানে বাঁক।



লুপের চারপাশে নানাপ্রজাতির ফুলের সমাহার। ছবি : পিন্টারেস্ট
মূলত পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি। দেখতে অনেকটা তাই মালভূমির মতো। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। ব্রিটিশরা দার্জিলিংকে তাদের গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। যার ফলস্বরূপ ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাতাসিয়া লুপ। বাতাসিয়া লুপের প্রবেশপথে রয়েছে স্ট্রিটফুডের সম্ভার। দোকানগুলোর পরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত তাই নির্দ্বিধায় ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো থেকে নিতে পারেন স্থানীয় খাবারের সুস্বাদ। ভেতরে বিশাল এক  চত্বর। সাজানো গোছানো ছিমছাম পরিবেশ। বিশাল ফুলের বাগান।

সবুজে ছাওয়া ঘাস, পাতাবাহার-লতাবাহার ইত্যাদি। বাঁধানো পথ। চত্বরের মাঝখানে বিশাল উঁচু কালচে গোলাকার স্তম্ভ। ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে তৈরি হয়েছে এটি। বৃষ্টি থেকে রক্ষা কিংবা বিশ্রাম নেয়ার জন্য কিছু ছাউনিও রয়েছে। বাগানের একপাশে দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন টয় ট্রেন। এই ট্রয় ট্রেনে ওঠার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর মধ্যে চেপে বাতাসিয়া লুপ পার হওয়া। ছোট্ট খেলনা রেলগাড়িটা যখন কু ঝিক ঝিক করে হুইসেল বাজিয়ে সবুজ ঘাসে মোড়া নানা রঙের ফুলের বাগানে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে আসবে দাঁড়াবে আবার পাক খেয়ে চলে যাবে, আপনি মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে থাকবেন। আর যদি আপনি ওই ট্রেনের সাওয়ারি হন তাহলে তো কোনও কথাই নেই।



ভোজনপ্রেমীদের জন্য আছে সুস্বাদু স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা। ছবি : ইউটিউব
বাতাসিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এখান থেকে দূরবীনের সাহায্যে দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম দৃশ্য। যার লোভে পর্যটকরা বারবার ছুটে আসেন এ লুপে। প্রায় সারাবছরই বৃষ্টি হয় বলে ভাগ্যগুণেই কারো কারো দর্শন মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। বাতাসিয়ায় একটি ইকো গার্ডেনও রয়েছে। এটি দার্জিলিংয়ে জৈব চাষ এবং বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সরবরাহ করে। এখানে আপনি জিঙ্গকো বিলোবার মতো অনেক বিরল প্রজাতির গাছ দেখতে পাবেন। এবং এখানে রডোড্রেনড্রন, সিলভার ফার্স এবং এমনকি চা গাছ রয়েছে। বাতাসিয়া লুপের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ওয়ার মেমোরিয়াল । 

১৯৫৫ সালে দার্জিলিং পাহাড়ের গোর্খা সৈন্যদের স্মরণে এটি খোলা হয়েছিল যারা ভারতের স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন যুদ্ধে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল। একটি উন্নত প্ল্যাটফর্মে একটি সেনোটাপ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একজন সৈনিকের মূর্তি রয়েছে। লুপের বাইরে একটি ছোট বাজারের দেখতে পাবেন। যদি খুব ভোরে পৌঁছতে পারেন , ঠিক বাইরেই ভ্রাম্যমান হাটের পসার  দেখবেন। যেখানে স্থানীয়রা হট সামোসাস বা সিঙ্গারা ইত্যাদি স্ন্যাক জাতীয় খাবার বিক্রি করে। বাজারের ব্যাগ, টুপি এবং অন্যান্য আলংকারিক আইটেম কেনার জন্য একটি ভাল জায়গা। রাস্তার বিপরীতে দোকান রয়েছে। কাপ, ফ্লাস্ক ইত্যাদি বিক্রি করছে।



লুপের বাইরে বসে স্থানীয়দের হাটবাজার। ছবি : গোজো ক্যাবস্
আরও কিছুটা নিচে নামলে পাবেন নানা রকমের রেস্তোঁরা এবং ক্যাফেশপ। আপনি যদি এখানে প্রাতঃরাশ বা এমনকি মধ্যাহ্নভোজের পরিকল্পনা করেন তবে একটা সুখবর আছে। তারা এখানে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় খাবারগুলোর পাশাপাশি দুপুরের খাবারের সময় চাইনিজ আইটেমও পরিবেশন করে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে ওয়াশরুম এবং টয়লেট রয়েছে। লুপটি উপভোগ করার জন্য একটি মজাদার উপায় রয়েছে।

দার্জিলিং থেকে ঘুমের জন্য একটি টয় ট্রেনে চড়ে বসতে পারেন যা দার্জিলিং স্টেশনে দিনে কয়েকবার ছেড়ে যায়। এটি কয়েক মিনিটের জন্য বাতাসিয়া লুপে থামে। প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে বাতাসিয়া লুপ। এখানে প্রবেশমূল্য  জনপ্রতি ১৫ রূপি। রয়েছে মহিলাদের জন্য আলাদা শৌচাগার ব্যবস্থাও।