দমদম পীরের ঢিবি : যশোর

ভ্রমণ পাগল মানুষের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হল দমদম পীরের ঢিবি


দমদম পীরের ঢিবি

ছবি : সংগৃহীত


 ভ্রমণ পাগল মানুষের জন্য নানান জেলার ভ্রমণ স্থান ঘুরে বেড়ানোই নেশা। বিভিন্ন জেলার বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য অবলোকনের জন্য আকর্ষণীয় সব ভ্রমণ স্থানগুলো থাকে ভ্রমণ প্রেমীদের আনাগোনায় মুগ্ধ। যারা এখনো যশোর জেলা ভ্রমণ করেননি তারা চাইলে ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন এই জেলাটি। ফুল ও খেজুর গুড়ের জন্য প্রসিদ্ধ এই জেলাটি বেশ প্রাচীন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরপুর এই যশোরে। আছে দেখার মত অনেক কিছু। এখানকার একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হল দমদম পীরের ঢিবি (Dam Dam Peer Mound)। যশোর সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মনিরামপুর উপজেলার ভোজগাতি ইউনিয়নের দোনার গ্রামে দমদম পীরের ঢিবি অবস্থিত। এই ঢিবিটি প্রথমে এলাকার জনগন খুঁজে পেয়েছিল। ১ ৯৮৬ সালে এই এলাকার লোকজন এখানে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করে। মাদ্রাসা নির্মাণের সময় ঢিবি থেকে মাটি কাঁটার সময় পুরনো ইটের তৈরি গাঁথুনি বেরিয়ে আসে। যার পরপরই এই স্থানটি ক্রমশ পরিচিতি লাভ করতে থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪-০৫ সালে সরকারিভাবে প্রথম এই ঢিবি খনন করা হয়। এই খননে এখানে ছাদ বিহীন ৮টি পূর্নাঙ্গ কক্ষ আবিষ্কৃত হয়। ২০০৬-০৭ সাল পর্যন্ত মোট ১৮টি কক্ষ পাওয়া যায়। এই কক্ষগুলোর দেয়াল জ্যামিতিক নকশার তৈরি। সিঁড়ির কারুকাজও প্রায় একরকম।


ইতিহাস

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রথমে এখানে ছিল বৌদ্ধদের বাস। এরপর আসে হিন্দু । এখান থেকে প্রাপ্ত মন্দিরের নকশার মধ্যে পদ্মপাপড়ি খচিত ইট ছিল। যা থেকে ধারণা করা হয়, এটা জৈন মন্দির ছিল। যা নির্মিত হয়েছিল ১০০ খৃষ্টপূর্বে। ধারনা করা হয়, এখানে পঞ্চনাগ বা সপ্তনাগের পূজা হতো। তারপরে সব শেষে আসে মুসলমান। সম্ভবত ধর্ম প্রচারে এসে তারা তৈরি করে পীরের আস্তানা। এই ঢিবি থেকে পোড়ামাটির ফলক, অলংকৃত ইট, পাথরের তৈরি বুদ্ধমূর্তি, ১৮টি কক্ষ, ব্রোঞ্জের মূর্তি, , ছয়টি কক্ষ, পোড়ামাটির ফলক ও পদ্মফুল, ধাতব আংটি,মাটির নিত্য ব্যবহার্য্য দ্রব্যসামগ্রী পাওয়া যায়। এখানকার প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, এটি ২য় বা ৩য় শতকের অর্থাৎ ১৮শ' বছরের আগে। বুদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম এই তিন ধর্মের সভ্যতার চিহ্ন এখানে ছড়িয়ে আছে। এই ঢিবির দমদম নামকরণের কারণ হল এই ঢিবির ওপর হাঁটার সময় দমদম আওয়াজ হতো। তাই এর নাম রাখা হয়েছে দমদম। এমন শব্দ কেন হতো এই সম্পর্কে কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু জানেন না। স্থানীয়দের মতে, দমদম পীরের ঢিবি থেকে কিছু দক্ষিণে মঙ্গল শাহ নামে এক পীরের আস্তানা ছিল। এলাকার মানুষ এক সময় এখানে তাদের নানা রোগের মানত করতো। এখন এগুলো অনেকটাই কমে গেছে।


কুমারী দিঘি

এই ঢিবির পাশে একটি দিঘি আছে। নাম কুমারী দিঘি। এই দিঘি নিয়ে কিংবদন্তী রয়েছে। এই দিঘির পাড়ে একটি কুয়া আছে। বলা হয়, কুমারী মেয়েরা এই কুয়ার কাছে গিয়ে কোন আচার অনুষ্ঠানের কথা বলতেই সোনার থালা ও চামচ ভেসে আসতো। অনুষ্ঠান শেষে কুয়ায় রেখে দিলে তা আবার তলিয়ে যেত। তাই এই দিঘিটির নাম হয় কুমারী দিঘি। এই কুয়ার খুব কাছেই নাম না জানা ৭টি ফুল গাছ ছিলও। কিংবদন্তি আছে , সেই আঠারশ' বছর আগে এই গাছগুলো লাগানো হয়। সময়ের গহ্বরে আর মাত্র দুইটি ফুলগাছ এখনও জীবিত আছে। বিরল প্রজাতির এই দুইটি ফুলের গাছকে স্থানীয়রা কেল কদম নামে ডাকে। এই গাছগুলো বছরের ৬ মাস মৃত এবং বাকি ৬ মাস জীবিত থাকে। এতটা সুন্দর ও সৌরভময় এমন ফুল দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। এই ফুল গাছ কেউ তুলে বাড়িতে লাগায় না। কারণ এই ফুলগাছ অন্য কোথাও লাগালে তা মারা যায়। অতীতে এই দিঘির অনেকাংশ জুড়ে থাকা ঝোপে দিনের আলো পৌছাতো পারতো না। তাই তেমন কেউ এর কাছে যেতো না কিন্তু ফুলের সুবাস বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তো। এই বিরল প্রজাতির ফুল গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।


যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে বাসে ও ট্রেনে যশোর পৌঁছনো যায় যশোর। ঢাকার কল্যাণপুর, গাবতলি ও কলাবাগান থেকে সোহাগ, গ্রিন লাইন, শ্যামলী এবং পরিবহনের বেশকিছু এসি ও নন-এসি বাস যশোরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। নন-এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা। যশোর শহর থেকে বাসে বা সিএনজি করে মনিরামপুরে পৌঁছাতে পারেন। সেখান থেকে অটোরিকশা বা রিকশায় চড়ে চলে যেতে পারেন দমদম পীরের ঢিবিতে।  


রুবাইদা আক্তার   এস এম