তোরাজা ল্যান্ড : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে পাহাড় ঘেরা গ্রাম
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তোরাজা ল্যান্ড
ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম তোরাজাল্যান্ড। ছবি : ট্রিপসেটারা
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি প্রদেশের রাজধানী মাকাসা থেকে প্রায় ৩২৮ কিলোমিটার উত্তরে তোরাজা ল্যান্ড অবস্থিত। তোরাজা ল্যান্ড আবার অনেকের কাছে টানা তোরাজা নামেও বেশ পরিচিত। তোরাজাল্যান্ড অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০- ২,৮৮০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এবং স্থানটি ছোট-বড় পাহাড়ের সমষ্টি। এই জায়গাটি একাধারে ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। ইন্দোনেশিয়া পর্যটন শিল্প কেন্দ্রিক হওয়ায় এই দেশের প্রায় প্রত্যেকটি প্রদেশ পর্যটকদের আকর্ষন করার মতো করেই সাজানো গোছানো। সেই তালিকা থেকে বাদ যায়নি এই তোরাজা ল্যান্ডও। জায়গাটির মোহনীয়তায় মুগ্ধ হতে প্রতি বছর এখানে বেড়াতে আসে হাজার হাজার পর্যটক। ইন্দোনেশিয়ার বালির পাশাপাশি কিছুটা সময় একান্তে কাটাতে এবং ইন্দোনেশিয়াকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে এখানে ভিড় জমায় অনেকে। ইতিহাস, ধর্ম, ভূগোল এবং সংস্কৃতি একত্রিত হয়ে অঞ্চলটিকে ঘিরে রয়েছে রহস্যের আভা। বিশাল জনবহুল এই অঞ্চলের বেশিরভাগই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, (ডাচ মিশনারিরা ধর্মান্তরিত হয়েছিল)।
মৃতদেহ রেখে উৎসব পালন করা হয় তোরজা ল্যান্ডে। ছবি : অল দ্যাটস্ ইন্টারেস্টিং
তোরাজানদের মধ্যে মানুষ মারা যাবার পর কবর দেয়া রীতির কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়। একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে দেহটি কয়েক বছর পর্যন্ত রাখা হয়। পরে উৎসবের মাধ্যমে কবর দেয়া হয়। উৎসবটি প্রায় এক সপ্তাহ অবধি পালন করা হয়। নাচ এবং মহিষ লড়াই অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসবে। মৃতের আত্মাকে পরের জীবনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মহিষ এবং শূকর জবাই করা হয়। তারপরে মৃত ব্যক্তিকে একটি ছোট গুহায় সমাহিত করা হয়। অঞ্চলটিতে ধান, কফি, লবঙ্গ চাষ করা হয়। আরবিকা কফি এখানে বেশ জনপ্রিয়। শুকনো মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) শিশুরা স্কুল থেকে বাড়ি এলে ধান কাটা হয়। এই ধান কাটাকে ঘিরেও আয়োজন করা হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশের। জেনে নেয়া যাক, তোরাজা ল্যান্ডে দেখার স্থানগুলো সম্পর্কে :
লেমো : রাঁতেপাও-এর দক্ষিণে ১১ কিলোমিটার দূরে লেমো অবস্থিত। এখানে কাঠের মূর্তির দেখা মিলবে। কাঠের মূর্তিগুলি মৃতদের প্রতিমূর্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।
লন্ডা :
ছবি : সংগৃহীত
লন্ডা আরও একটি সমাধিস্থল। এর ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ রয়েছে। এখানে ভ্রমণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সুযোগ দেবে তা নির্দ্বিধায় বলাই যায়।
বরি পারন্ডিং : এটি একটি সমাধিস্থল। এই জায়গাটি যথেষ্ট সুন্দর এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে।
কাম্বিরা : কম্বিরা টানা তোরাজার অন্যতম বিখ্যাত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া স্থান। গ্রামটি একটি বনের মাঝে অবস্থিত এবং অনেক শিশু গাছ লক্ষ্য করা যায়।
কানাকেসু :
শত বছরেরও বেশি পুরানো কানাকেসু। ছবি : ট্রিপ এডভাইজর
কানাকেসু তোরাজা ল্যান্ডের অন্যতম বিখ্যাত পর্যটক আকর্ষণ। এটি তোরজা ল্যান্ডের ঐতিহ্যের অন্যতম সেরা উদাহরণ। গ্রামটি প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো এবং ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে স্থান করে নিয়েছে।
বুলু মার্কেট : সপ্তাহে ৬ দিন এই বাজার বসে। স্থানীয়রা তাদের কেনা-বেচা এই মার্কেটে করে থাকে।
গুণুং সিসিয়ান : এই পাহাড়টি তোরাজা ল্যন্ডের শীর্ষ স্থান। পায়ে হেঁটে যেতে প্রায় ৬ ঘন্টা সময় লাগে।
সাদান ও মাইয়িং :
সাদান নদী। ছবি : গো সেলেবস্
তোরাজা ল্যান্ডের দুটো নদী। এখানেও পর্যটকেরা ভিড় জমায়।
বাতুতুমঙ্গা : এটি রান্তেপাওর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে। এখানে কিছু দুর্দান্ত ক্যাফে এবং রেস্তোঁরা রয়েছে যেখানে খুব সু-স্বাদু খাবার পাওয়া যায়।
ভ্রমনের সেরা সময় : সারা বছর ভ্রমনের সুবিধা থাকলেও পর্যটকেরা সাধারনত স্থানীয়দের আয়োজিত উৎসবমুখর পরিবেশকে উপভোগ করতে এই অঞ্চলে ভ্রমণ করে থাকে। জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে ফসল কাটার পরে প্রধান অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মৌসুম হিসেবে উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই সময়টাতে পর্যটকদের ভিড় বেশি হয়ে থাকে।
খাওয়া এবং থাকা : থাকার জন্য রয়েছে অনেক হোটেল। হোটেলগুলোতে একক এবং ডাবল বিছানা, টেলিফোন লাইন, বিনোদন, মানসম্মত খাবারের সুবিধা সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া স্পোর্টস সুবিধা, স্পা এবং ম্যাসাজ, লন্ড্রি এবং আরও অনেক সুবিধা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হোটেলগুলোর মধ্যে রয়েছে : তোরাজা হেরিটেজ হোটেল, তোরাজা মিসিলিয়ানা, হোটেল তোরাজা প্রিন্স হোটেল, তোরাজা সহিদ হোটেল এবং টোঙ্গকনান লেইউক সিংহ ইত্যাদি। রাঁতেপাও এবং মাকালে অসংখ্য রেস্তোরা রয়েছে। তারা ইন্দোনেশিয়ান, চাইনিজসহ আরও অনেক ধরনের খাবার তৈরী করে। সেলিব্রেস, পালোপো সেন্ট, সরুরান, ম্যাপানিউক্কি স্ট্যান্ড ক্রিস্টো, রামা, পদাং রেস্তোরাঁ সহ আরো অনেক রেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে একটু খোজ করলেই।
যেভাবে যাবেন : মাকাসার বিমানবন্দর থেকে বিমানে তোরাজা ল্যান্ড যাওয়া যায়। বাসে করেও যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ৮-১০ ঘন্টা সময় লাগবে। আবার চাইলে ট্যাক্সিতেও তোরাজা ল্যান্ড যাওয়া যায়।
ভ্রমণ সতর্কতা :
- ভিন্ন দেশে নিজের ভদ্রতা বজায় রাখুন।
- যাবার পূর্বে অবশ্যই স্থানগুলো সম্পর্কে জেনে নিন।
- কার ধর্মীয় রীতিতে আঘাত হানে এমন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
তথ্যসূত্র : উইকিট্রাভেল