অটোমান সম্রাটদের রাজপ্রাসাদ টপকাপি প্রাসাদ, তুরস্ক

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : যেখানে সংরক্ষিত আছে নবী-রাসুলদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র



টপকাপি প্রাসাদ, ইস্তানবুল, তুরস্ক।

টপকাপি প্রাসাদ, ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : ব্রিটানিকা


 তুরস্কের প্রাক্তন রাজধানী ইস্তানবুল বেশ প্রাচীন এক শহর। শহরটির এক পাশে বসফরাস প্রণালী এবং অন্য পাশে মরমর সাগর। ইস্তানবুল পৃথিবীর একমাত্র শহর যেটি একাধারে এশিয়া এবং ইউরোপজুড়ে অবস্থিত। একাধারে অটোমান এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা ইস্তানবুল বর্তমানে বেশ পর্যটক বহুল নগরী। অটোমান সম্রাটদের রাজপ্রাসাদ অথবা “টপকাপি প্রাসাদ” (Topkapi Palace)মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। তুরস্কের সুলতানরা একসময় তিন মহাদেশ শাসন করতেন! তুর্কি মুসলিম দের হাতে গড়ে ওঠা এই শহরের অনেক নিদর্শন পর্যটকদের প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায়। ইসলামিক ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক হিসেবে বেশ কিছু নিদর্শন যেন এখনো এর আভিজাত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত 'টপকাপি প্রাসাদ' সেসবের অন্যতম নিদর্শন।

ইতিহাস

এটি ১৪৫৩ সালে নির্মিত। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ এটি নির্মাণ করেন ইস্তানবুল জয়ের ৬ বছর পর। তবে টপকাপি প্রাসাদ একিই সাথে খিলাফতের ও শেষ চিহ্ন। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুর্কি মুসলিমদের হাতে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদ বহু বিবর্তনের সাক্ষী।


টপকাপি প্রাসাদ, ইস্তানবুল, তুরস্ক।

টপকাপি প্রাসাদের গেইট, ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : ব্রিটানিকা


প্রায় সব সুলতান তাদের শাসনামলে এর কিছু না কিছু পরিবর্তন করেছেন। বহু রুচির সমাবেশ এই রাজপ্রাসাদে। টপকাপি রাজপ্রাসাদ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজ ভবনের একটি। ৭০ হেক্টর এলাকা নিয়ে এটি নির্মিত। প্রায় ৪,০০০ লোক প্রাসাদটিতে বাস করতে পারতেন। ২৫ জন সুলতান এবং তাদের পরিবারবর্গ এখানেই অবস্থান করেছিলেন প্রায় ৪০০ বছর ধরে ।

টপকাপি প্রাসাদ দু-ভাগে বিভক্ত

অন্দেরুন ও বাইরুন অথবা অন্দরমহল এবং বহির্বিভাগ। চারটি স্তরে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদের দুটি অন্দেরুন এবং বাকী দুটি বাইরুনে। রাজফটক দিয়ে প্রবেশের পরেই দেখা মিলবে হাসপাতাল, অস্ত্রাগার, গুদামঘর এবং গার্ড দের কোয়ার্টার এলাকা। প্যারেড স্কয়ার পার হয়ে দেখা মিলবে 'রাজকীয় দিওয়ান' অথবা 'দরবার'। তৎকালীন সপ্তাহে চারদিন দরবার বসতো। প্রায় সাড়ে তিনশ' বছর ধরে পরম্পরা হিসেবে এটি পালিত হয়েছে। দিওয়ানের দুটো অংশ। উজিরের দরবার এবং রেকর্ড রুম। দরবারের পাশেই অনেক বড় রান্না ঘর। রান্নাঘরের অংশটিতেই চিনা মাটির রান্না সামগ্রীর বিশাল সংগ্রহশালা। বলা হয়ে থাকে যে, এটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম রান্না সামগ্রীর সংগ্রহশালা। রান্না ঘরের পাশেই অবস্থিত খাবার ঘর, ডেজার্ট এবং কফি পানের ঘর।


টপকাপি প্রাসাদ, ইস্তানবুল, তুরস্ক।

টপকাপি প্রাসাদের অন্দরমহল, ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : ট্রিপ ডট কম


অন্দরমহলের প্রথম অংশে সুলতান মন্ত্রীপরিষদ এবং বিদেশী দূতদের সাথে দেখা করতেন। অন্দরমহলে 'কাসিকাস' হীরকখণ্ড পর্যটকদের জন্য প্রদর্শন করে রাখা হয়েছে। হীরকখণ্ডটি ৮৬ ক্যারেটের যার চারপাশে ৪৯টি ক্ষুদ্র হীরা দিয়ে বানানো। বলা হয়ে থাকে, এটি পারস্য সম্রাট নাদির শাহকে উপহার দেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু পথিমধ্যে নাদির শাহের নিহত হওয়ার খবর আসায় এটি এখানেই সংরক্ষিত হয়ে আছে।

এখানে সবচেয়ে নিরাপত্তার মাঝে সংরক্ষিত হয়ে আছে হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যবহৃত চাদর, পায়ের ছাপ, দাড়ি, দাঁত, দাউদ (আঃ) এবং ইয়াহিয়া (আঃ)-এর তলোয়ার, মুসা (আঃ)-এর লাঠি এবং বিখ্যাত সাহাবার তলোয়ারসহ আরও অনেক কিছু। সাহাবাদের হাতে লিখা কুরআন ও এখানে প্রদর্শন করে রাখা আছে। ইসলামিক ঐতিহ্যের অমূল্য সংগ্রহশালা পসরা যেন এখানে। টপকাপি রাজপ্রাসাদের মূল আকর্ষণ এটিই। একাধারে ধর্মীয় এবং ইতিহাসের দারুণ এক মিলনস্থল এই প্রাসাদটি। এছাড়াও পাহাড়ি কোলে অবস্থিত রেস্তরাঁ এবং তার সামনে বসফরাসের নীল পানির সমাহার আপনার টপকাপি প্যালেস ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখবে।

তুরস্কের ঐতিহাসিক ইউনেস্কো সাইট নিয়ে জানতে আরও পড়ুন  : ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : এশিয়া মহাদেশ (তুরস্ক পর্ব)
মোঃ খালিদ বিন জামান   এস এম