চলুন দেখে নিই, কোন কোন দেশের সীমান্ত পর্যটকদের জন্যে পুনরায় খুলতে শুরু করেছে?

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জুলাই থেকেই অধিকাংশ দেশ স্বাগত জানাতে পারে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের



সাইপ্রাস ভ্রমণে গিয়ে কোনো পর্যটক করোনা আক্রান্ত হলে থাকা, খাওয়াসহ চিকিৎসা ব্যয় বহনের প্রস্তাব দেশটির

সাইপ্রাস ভ্রমণে গিয়ে কোনো পর্যটক করোনা আক্রান্ত হলে থাকা, খাওয়াসহ চিকিৎসা ব্যয় বহনের প্রস্তাব দেশটির। ছবি : ব্রিটানিকা


করোনা ভাইরাসের আঘাতে বিশ্ব এখনও আহতাবস্থায় আছে, মহামারির তাণ্ডবে এখনও বহু দেশ দিশেহারা। করোনার প্রভাব থেকেও যে বড় ধাক্কা বিশ্ব সংকটের সৃষ্টি করতে যাচ্ছে তা হলো অর্থনৈতিক ধাক্কা। চলতি বছরের শুরু থেকেই মহামারির কারনে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে বিশ্ববাসী, সঙ্গে পঙ্গু হয়ে যেতে শুরু করে একেক দেশের অর্থনৈতিক কারবার। বিশ্বের বহুদেশের জিডিপি'র সিংভাগ আসে পর্যটন খাত থেকে, এমন অনেক দেশ আছে যেসব দেশে নেই কোনো আয়ের উৎস। পর্যটকদের ওপরেই নির্ভর করে তাদের জীবিকা। সেসব দেশের সরকারের কাছে করোনার আঘাত যেন এক অভিশাপ হয়ে এসেছে, স্বাস্থ্যসেবার সাথে লড়াইতে যখন হিমশিম তখন এমন দীর্ঘকালীন পর্যটকশূন্যতা তাদের জন্যে অচিন্তনীয় সংকট।


সাইপ্রাস

সাইপ্রাস। ছবি : গেটি ইমেজ


এমতাবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দেশগুলো তাদের সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে। মালদ্বীপ থেকে সাইপ্রাস, থাইল্যান্ড থেকে ফ্রান্স সরকার ধীরে ধীরে তাদের কোভিড-১৯ লকডাউন শিথিল করছে, খুলে দিচ্ছে সীমান্ত, সচল করতে শুরু করেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এমনকি বহুদেশ তাদের পর্যটন শিল্পের পুনরুদ্ধারে পর্যটকদের দিচ্ছে লোভনীয় সব অফার। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যে আজ জানানো হবে, বিশ্বের কোন কোন দেশ খুলে দিচ্ছে পর্যটন শিল্প। কোন কোন দেশে ভ্রমণ করা যাবে শীঘ্রই। এসব নিয়েই আজকের আয়োজন। চলুন দেখে নেয়া যাক দেশগুলো সম্পর্কে :




সাইপ্রাস। ছবি : ফ্রাংকো ক্যাপেলিয়ারি


সাইপ্রাস

সাইপ্রাস তার পর্যটন শিল্পকে সচল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপের দেশটির কর্মকর্তারা মার্কিন বার্তা সংস্থা সিএনএন’কে জানায়, অবকাশকালীন সময়ে করোনা পজিটিভ আসা ভ্রমণকারীদের ব্যয়ভার বহন করার অফার দিচ্ছে। সিএনএন-এর সাথে শেয়ার করা একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশটিতে ভ্রমণকালীন যেসব পর্যটক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সাইপ্রিয়ট সরকার তাদের ভ্রমণের সময় থাকার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি খাবার, পানীয় এবং ওষুধ বিনামূল্যে সরবারহ করবে। ২৬মে সরকার, এয়ারলাইনস এবং ট্যুর অপারেটরদের দেয়া পাঁচ পৃষ্ঠার চিঠিতে এই বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।


মালদ্বীপে ইতোমধ্যেই একাধিক রিসোর্ট চালু করেছে

মালদ্বীপে ইতোমধ্যেই একাধিক রিসোর্ট চালু করেছে। ছবি : সংগৃহীত


মালদ্বীপ

ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপবেষ্টিত ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ। করোনাউত্তর পর্যটন শিল্পে দেশটি ফের একচেটিয়া ব্যবসা করবে বলে মনে হচ্ছে। ২০১৯ সালে ১৭ লক্ষাধিক পর্যটক মালদ্বীপ ভ্রমণ করে এবং ২০২০ সালে যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমিত ছিল। এক হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি তার জাতীয় সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে এবং মার্চ মাসে প্রথম দুজন করোনভাইরাস শনাক্তের পরেই বিমান আসা-যাওয়া বাতিল করে দেয়। তবে, এখানে প্রায় ৩০টি রিসোর্ট খোলা রয়েছে, পর্যটকরা দেশে ফিরে আসার পরিবর্তে বিখ্যাত হানিমুনের গন্তব্যে স্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠবেন। মালদ্বীপে ৪ জুন পর্যন্ত প্রায় ১,৪৫৭টি কোভিড -১৯ মামলা শনাক্ত হয়েছে এবং পাঁচটি মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে।


দ্বীপবেষ্টিত দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ

দ্বীপবেষ্টিত দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ। ছবি :সংগৃহীত


বছরের শেষের দিকে পর্যটন খাত সচল করবে বলে প্রথমে ধারণা করা হলেও কর্মকর্তারা এখন জানায় যে তারা জুলাইতেই সেখানে ভ্রমণের জন্যে প্রবেশদ্বার খুলে দিতে পারে। পর্যায়ক্রমে পুনরায় খোলার প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে বেসরকারী বিমান এবং সুপার ইয়টগুলো পহেলা জুন থেকে প্রবেশের অনুমতি পাবে। ৩০ শে মে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি সরকারী বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'আমরা ২০২০ সালের জুলাইয়ে পর্যটকদের জন্য আমাদের সীমানা পুনরায় খোলার পরিকল্পনা করছি।'


ছবির মতো সুন্দর বালি

ছবির মতো সুন্দর বালি। ছবি : সংগৃহীত


বালি

ইন্দোনেশীয় দ্বীপ বালি পর্যটকদের কাছে প্রধান সারির একটি ভ্রমণ গন্তব্য। করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সাফল্য পেয়েছে। ৪ জুন পর্যন্ত সেখানে ৩৫০ এর ও কম করোনা আক্রান্তের খবর মিলেছে এবং ৪ জন মারা যায় বলে জানা যায়। নয়নাভিরাম ইন্দোনেশিয়ান এই দ্বীপটি আগামী অক্টোবরের মধ্যে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে পারবে বলে জানায়। বালির অর্থনীতি পর্যটন শিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে প্রায় ৬৩ লাখ দ্বীপটিতে ভ্রমণ করেছে।




বালি, ইন্দোনেশিয়া। ছবি : সংগৃহীত


 ‘নো ট্যুরিস্ট, নো মানি’ এমন কথা বলে বালির ট্যুর গাইড মংকু নিউমন কান্দিয়া এপ্রিলে এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, ‘করোনাভাইরাস বালিনিয়ের অর্থনীতি ভেঙে দিয়েছে ...(মধ্য-মার্চ) থেকে যখন সামাজিক-দূরত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তখন থেকে এটির অর্থনীতির একটি খাড়া পতন হয়েছে।’ বর্তমানে কূটনীতিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং দাতব্য সংস্থার কর্মীব্যতীত সমস্ত বিদেশী নাগরিকের জন্যে ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং দ্বীপে প্রবেশকারী যে কোনও ব্যক্তিকে অবশ্যই পরীক্ষা করে এবং সাথে তারা কোভিড-১৯ মুক্ত রিপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে।


ফ্রান্স সরকার দ্রুত পর্যটন খাত সচল করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে

ফ্রান্স সরকার দ্রুত পর্যটন খাত সচল করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ছবি : আল-জাজিরা


ফ্রান্স

করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর আগে ফ্রান্স ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করা দেশ। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেনজেন জোনের বাইরের সমস্ত দেশ থেকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বিধিনিষেধ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক বা যুক্তরাজ্য থেকে আগতদের বাদে অন্যান্য দেশ থেকে প্রবেশকারী যাত্রীরা কমপক্ষে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের করোনভাইরাস কোয়ারিন্টিনে থাকতে হবে। ফরাসী সরকার ধীরে ধীরে দেশটি থেকে লকডাউন তুলে নিচ্ছে। ভালবাসার নগরী প্যারিসের এই দেশে এখন ১০০ কিলোমিটার অবধি গাড়ি ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং সৈকতগুলো আবারও চালু হতে শুরু করেছে। তবে ফ্রেঞ্চ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য সীমান্ত বিধিনিষেধকে সহজ করতে কোনও তড়িঘড়ি করছে না।




ফ্রান্স। ছবি : সংগৃহীত


প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড ফিলিপ সম্প্রতি আক্রান্ত পর্যটন খাতকে বাড়াতে ১৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘ভ্রমণের পক্ষে যা ভাল তা প্রায়শই ফ্রান্সের পক্ষেও ভাল, যা পর্যটনকে আঘাত করে তা ফ্রান্সকে আঘাত করে।’ দেশটির হোটেল, বার, রেস্তোঁরা ও ক্যাফেগুলিকে কমপক্ষে ২ জুন অবধি বন্ধ ছিল। প্যারিসের দর্শনীয় স্থানগুলো, যেসব বর্তমানে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত সেগুলোও দ্রুত খুলে দেয়া হবে জানায় দেশটির সরকার। এছাড়াও, ২৯শে মে ঘোষণা করা হয়েছিল যে দেশটির সর্বাধিক পরিদর্শন করা যাদুঘর ‘ল্যুভর মিউজিয়াম’ আগামী ৬ জুলাই আবার খুলবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পর্যটন সম্ভবত আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পর্যটন খাত ফরাসি অর্থনীতির অন্যতম মুকুট, এটিকে উদ্ধার করা জাতীয় অগ্রাধিকার।’


গ্রিস

গ্রিস। ছবি : সংগৃহীত


গ্রিস

গ্রিসের মোট জিডিপি’র প্রায় ২০ শতাংস আসে পর্যটন খাত থেকে। এদিক থেকে দেশটির পাঁচটি কাজের মধ্যে একটি পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এমন অবস্থায় ভূ-মধ্যসাগরীয় দেশটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পর্যটকদের কাছে পুনরায় খুলে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলে আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নেই। ইউরোপীয় দেশ, যা প্রথম দিকে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার করোনভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা কম রাখতে পেরেছে। আগামী ১৫ই জুন পর্যটকদের স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে গত মাসের ২০ তারিখে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস সিএনএন’কে জানিয়েছে।




গ্রিসে নির্ধারিত দেশগুলো থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই পর্যটকরে প্রবেশ করতে পারবেন। ছবি : গেটি ইমেজ


এছাড়াও যেসব দেশে দ্রুত পর্যটনকে সচল করতে সময় নির্ধারণসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে তার মধ্যে আছে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, পর্তুগাল, মিশর, যুক্তরাজ্য, ইউএই, জর্জিয়া, আরুবা, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্ক।  

নাবিলা বুশরা   এস এম