কুড়িখাই মেলা : কিশোরগঞ্জের প্রায় ৪০০ বছরের পুরাতন এক উৎসবের গল্প
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শত বছর ধরে আজও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কুড়িখাই মেলা
ঐতিহ্যবাহী কুড়িখাই মেলা, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ। ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ ডট কম
'তোমরা দেখো গো আসিয়া
কমলায় নৃত্য করে থমকিয়া থমকিয়া।'
নৃত্য-গীতি, উৎসব আর আনন্দে পরিপূর্ণ বারো মাসে তের পার্বণের দেশ আমাদের এই মাতৃভূমি। বছরের সব সময়েই কোথাও না কোথাও কোন না কোন উৎসব চলতেই থাকে। গ্রামীণ এসব লোকজ উৎসব আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে, আমাদের শিকড়কে প্রতফলিত করে। অনেক স্থানেই আধুনিকতার ছোয়া লাগার সাথে সাথেই এই উৎসবেও পড়েছে ভাটা, হারিয়ে গেছে লোকজ সংস্কৃতি আর উৎসবের রং। তবে কিছু স্থানে এখনও ঐতিহ্যবাহী এসব উৎসব গুলোর প্রচলন রয়েছে, তাদেরই মধ্যে একটি প্রাচীন লোকজ উৎসবের সাথে পরিচিত হব আমরা আজকে। কিশোরগঞ্জ, হাওড় বাওড় আর নদীনালা বিধৌত একটি জেলা, এই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে প্রায় চারশত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এক মেলা, নাম তার কুড়িখাই মেলা। প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ সোমবার সপ্তাহব্যাপী এই মেলা শুরু হয়। এটি কিশোরগঞ্জ এবং তার আশেপাশের এলাকাগুলোর মধ্যে সবথেকে বড় গ্রামীণ মেলা।এ মেলার ইতিহাস সু-প্রাচীন। ৩৬০ আউলিয়ার প্রধান হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন হযরত শাহ শামছুদ্দীন বুখারী (রহঃ), যিনি বাংলা ১২২৫ সনে তিন জন সঙ্গী নিয়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের কুড়িখাই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তিনিই ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম ইসলাম ধর্ম-প্রচারক এবং বারো আউলিয়াদের মধ্যে একজন। তার মৃত্যুর পরে তার ভক্তরাই এই মেলার প্রবর্তন করেন। প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ সপ্তাহে এই মহান মনীষীর মাজারজুড়ে বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। মূলত সোমবার রাত্রিব্যাপী জিকির- আজগর এবং মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে হযরত শাহ শামছুদ্দীন বুখারী (রহঃ) এর ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয় এবং তারপর দিন প্রায় এক দেড় কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে বসে বিশাল এই কুড়িখাই মেলা।
মেলার মূল আকর্ষণ বিশাল সাইজের মাছের সমারোহ। ছবি : ইউএনবি ডট কম ডট বিডি
এই মেলায় পাওয়া যাবে বিভিন্ন রকম কাঠের জিনিসপত্র, ছোটদের হরেক রকমের খেলনা, খাবারের মধ্যে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পিঠাপুলি, মিষ্টি, মিঠাই-মন্ডা, সন্দেশ, মুড়িমুড়কি, বিন্নি খৈ, চালভাজাসহ নানা পদের এক বিশাল সমারোহের দেখা মিলবে এখানে। বিভিন্ন ধরণের পণ্য কেনাবেচার বাইরেও এ মেলায় দেখা পাওয়া যাবে বিনোদনের এক বিশাল আয়োজনের, সার্কাস, মৃত্যুকূপ, বাদরনাচ, পুতুলখেলা, নাগরদোলা, যাত্রাপালা ইত্যাদি সবকিছুই রয়েছে এই মেলায়। বিনোদনের বিভিন্ন আয়োজন, আর দূরদূরান্ত থেকে মানূষের আনাগোনা এই মেলাকে অত্র এলাকার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত করেছে। কুড়িখাই মেলার মূল আকর্ষণ হচ্ছে এর মাছের হাট। শুধুমাত্র এই মাছের হাট দেখতেই অনেকে দূরদূরান্ত থেকে এই মেলায় আসেন। এই হাটে বোয়াল, চিতল, আইড়, রুই, কাতলা, সিলভার কার্প , পাঙ্গাশ, বাঘা আইড় ইত্যাদি সহ প্রায় চার শতাধিক প্রজাতির বিশাল মাছের হাট বসে এই মেলায়। এই মেলাকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই মাছ বিক্রেতারা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চলের হাওড় এবং নদী থেকে এসব মাছ সংগ্রহ করে মেলায় বিক্রির জন্যে নিয়ে আসেন।
বিশাল সাইজের এসব মাছ বিক্রি হয় হাজার থেকে লক্ষ টাকায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কুড়িখাই মেলার বোয়াল মাছ খেলে সেই বছরের জন্যে শনির দশা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। অত্র অঞ্চলে এই মেলাকে কেন্দ্র করে বাড়ির জামাই এবং অতিথিবৃন্দকে দাওয়াত করা হয়। জামাইদের মধ্যে কে কত বড় মাছ কিনতে পারলো সেটা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধনাঢ্য ব্যাক্তিবর্গ এই মেলা থেকে বিশাল সাইজের মাছ সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
মেলায় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম নাগরদোলা। ছবি :বিডি প্রতিদিন ডট কম
সাতদিনের এই মেলার শেষ দুদিন চলে আরেক আকর্ষণীয় উৎসব, নাম যার 'বউ মেলা'। শেষ দুদিন বরাদ্দ থাকে কেবল বাড়ির বৌ-ঝি'দের জন্যে। বিভিন্ন বয়সের নারীরা এসে এই দুইদিন মেলায় শাড়ি, চুড়ী, আলতা, গহনা আর ঘর গৃহস্থালির জিনিসপত্র কেনাকাটা করে থাকেন। বছরের পর বছর ধরে এই মেলা অত্র অঞ্চলের মানুষের লোকসংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। শুধু সংস্কৃতিই নয়, এই মেলা অনেকের জন্যে জীবন এবং জীবিকারও মাধ্যম বটে।
এই মেলার সময় চারিদিকে কেমন উৎসবের ছোয়া লাগে, মনে লাগে রং, বাতাসে যেন ভেসে বেড়ায় আনন্দের সুর। সারাবছর খেটে খাওয়া মানুষগুলি যেন ফিরে পায় জীবনের রূপ, রস,গন্ধ এবং স্পন্দন। এই ভালোবাসার এবং ভালোলাগার উৎসবের সাক্ষী হতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন কুড়িখাই মেলা থেকে। উৎসবের রঙ্গে রাঙ্গিয়ে তুলতে পারেন জীবনের কিছুটা মুহূর্ত, খারাপ লাগবে না কথা দিতে পারি।
কখন ও কীভাবে যাবেন : কুড়িখাই মেলা অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর বাংলা মাঘ মাসের শেষ সোমবার থেকে, ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণত শুরু হয় এই মেলা। এই বছর মেলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখ থেকে। সপ্তাহব্যাপী এই মেলা চললেও মেলা সরগরম থাকে প্রথম ৩/৪ দিন। এই মেলায় যেতে হলে আপনাকে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে প্রথমে যেতে হবে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে। ঢাকার গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ এবং মহাখালী থেকে বি আর টি সি, অনন্যা, অনন্যা ক্লাসিক, জলসিড়ি, যাতায়াত ইত্যাদি পরিবহনের এসি/নন এসি বাস কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানভেদে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। সময় লাগবে আড়াই থেকে ৩ ঘন্টা। কিশোরগঞ্জগামী বাসে উঠে কটিয়াদিতে নামতে হবে। কটিয়াদি থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি'তে করে যেতে পারবেন কুড়িখাই মেলায়। এছাড়াও আপনি যদি ট্রেনে আসতে চান তাহলে ঢাকা টু কিশোরগঞ্জ গামী ট্রেনে উঠে নামতে হবে কিশোরগঞ্জের মানিকখালী স্টেশনে। সেখান থেকে সিএনজি তে জনপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যেতে পারবেন এই মেলায়।
তথ্যসূত্র : mailto:https://www.banglanews24.com/national/news/bd/700859.details mailto:https://www.banglatribune.com/journey/news/417799/%E0%A7%AA%E0%A7%A6%E0%A7%A6-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A7%9C%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9B-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF mailto:https://www.jagonews24.com/country/news/209533