চাপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত ৫ শতকের ঐতিহ্য ছোট সোনা মসজিদের ইতিহাস

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ছোট সোনা মসজিদ



চাপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ

ছবি : ফ্লিকার



প্রায় ৫ শতাব্দীর ঐতিহাসিক সাক্ষী উত্তরবঙ্গের জেলা, আমের রাজ্য হিসেবে খ্যাত চাপাইনবাবগঞ্জের এক মসজিদ। নাম তার ছোট সোনামসজিদ। এই মসজিদ প্রাঙ্গণে শায়িত আছেন মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর সন্তান। মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে সীমানাপ্রাচীরের ভেতরেই বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মুক্তিযুদ্ধে ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হকের কবর। সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন বলে আখ্যায়িত এই ছোট সোনা মসজিদ। এটি বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরুজপুর কোয়ার্টারের তাহখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বিশাল এক দিঘির দক্ষিণপাড়ের পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে এর অবস্থান।

মসজিদের কিছুদূর পশ্চিমে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক কয়েক বছর পূর্বে নির্মিত একটি আধুনিক দ্বিতল গেস্ট হাউস রয়েছে। গেস্ট হাউস ও মসজিদের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি আধুনিক রাস্তা চলে গেছে। ধারনা করা হয় রাস্তাটি পুরনো আমলের এবং একসময় এটি কোতোয়ালী দরওয়াজা হয়ে দক্ষিণের শহরতলীর সঙ্গে গৌড়-লখনৌতির মূল শহরের সংযোগ স্থাপন করেছিল। রাজশাহী থেকে মহাসড়ক হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ঢুকতেই বিশ্বরোডের মোড়। সেখান থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর সড়ক হয়ে ছোট সোনামসজিদ ৩৮ কিলোমিটারের পথ। মূল সড়ক থেকে নেমে ডানে অপ্রশস্ত রাস্তা ধরে ৫০-৬০ ফুট এগোলেই উত্তর-পূর্ব দিকে একটি বড় পুকুর। বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে সামান্য এগোলেই ছোট সোনামসজিদের তোরণ।


চাপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ- বীর বাঙ্গালীর কবর

দুই বীর বাঙ্গালি শায়িত আছেন এখানে। ছবি : উইকিপিডিয়া



সোনামসজিদ

মধ্যযুগের সুলতানি আমলের গৌড়নগরীর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা ছোট সোনামসজিদ। মসজিদটিকে বলা হতো ‘গৌড়ের রত্ন’। মসজিদের বাইরের দিকে সোনালি রঙের আস্তরণ ছিল। সূর্যের আলো পড়লেই তা সোনার মতো ঝলমল করে উঠত। এ জন্যই এর নাম হয়ে যায় সোনামসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রধানতম নিদর্শন হচ্ছে ছোট সোনামসজিদ। মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৩-১৫১৯) নির্মিত হয় সোনামসজিদ। নির্মাতা হিসেবে ওয়ালী মুহাম্মদের নাম পাওয়া যায়। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বইয়ের প্রধান সমন্বয়কারী নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জকে চেনার একটি প্রতীক এই ছোট সোনামসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ঐতিহাসিক গৌড়নগরীর আরও স্থাপনা রয়েছে। যাতায়াত, থাকা ও নিরাপত্তার সুবন্দোবস্ত করা গেলে এসব স্থানের পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

ছোট সোনা মসজিদ, গৌড়-লখনৌতি

প্রধান প্রবেশপথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস, মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপিতে নির্মাণের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলি মুছে গেছে। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর নামের উল্লেখ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মসজিদটি তাঁর রাজত্বকালের (হি. ৮৯৯-৯২৫/ ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.) কোনো এক সময় নির্মিত।


বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর। ছবি : উইকিপিডিয়া


বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত সুলতানি আমলের সৌধগুলির মধ্যে ছোট সোনা মসজিদ সর্বোত্তম সংরক্ষণ-নিদর্শন। অলংকরণের ক্ষেত্রে যে সোনালি গিল্টির ব্যবহার থেকে এর সোনা মসজিদ নামকরণ হয়েছে তা এখন আর নেই। মসজিদ প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে আদিতে একটি বহির্দেওয়াল ছিল। পূর্ব পশ্চিমে ৪২ মিটার এবং উত্তর দক্ষিণে ৪৩ মিটার লম্বা এ বহির্দেওয়ালের পূর্ব দিকের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ফটক ছিল। শুধু ফটকটি ছাড়া সমগ্র বহির্দেওয়াল এখন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে স্থানে স্থানে এখনও এর চিহ্ন সুস্পষ্ট।

অভ্যন্তর

বর্তমানে মূল চৌহদ্দি দেওয়ালের স্থলে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে। স্থানীয় লোকদের থেকে জানা যায় যে, ফটকের নিকটে এবং দিঘির দক্ষিণপাড়ে আদিতে সোপানবিশিষ্ট একটি পাকা ঘাট ছিল। মসজিদটি ইট ও পাথরে নির্মিত। এ মসজিদের মূল ইমারত আয়তাকার এবং বাইরের দিকে উত্তর দক্ষিণে ২৫ দশমিক ১ মিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে ১৫ দশমিক ৯ মিটার। চারটি দেওয়ালই বাইরের দিকে এবং কিছুটা অভ্যন্তরভাগেও  গ্রানাইট পাথরখন্ডের আস্তরণ শোভিত। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার পর সংস্কার কাজের সময় পশ্চিম দেওয়ালের দক্ষিণ অংশে পাথরের আস্তরণ অপসারিত হয়েছে। মসজিদের বাইরের দিকে চার কোণে চারটি বহুভুজাকৃতির বুরুজের সাহায্যে কোণগুলিকে মজবুত করা হয়েছে।

এ বহুভুজ বুরুজের নয়টি পার্শত বাইরে থেকে দেখা যায়। পেছন দেওয়ালের মধ্যবর্তীস্থলে কেন্দ্রীয় মিহরাবের বাইরের দিকে আয়তাকার একটি বর্ধিত অংশ রয়েছে। কার্নিশগুলি ধনুকের মতো বাঁকানো এবং ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ছাদের কিনারায় পাথরের নালি বসানো আছে। মসজিদের পূর্বদিকের সম্মুখভাগে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে তিনটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। পূর্ব দেওয়ালের খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার বরাবর পশ্চিম দেওয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব। অধিকাংশ মিহরাবের পাথর সরিয়ে নেয়ার ফলে এখন সমগ্র পশ্চিম দেওয়াল অনাবৃত হয়ে পড়েছে; অথচ একসময় এ দেওয়ালই ছিল মসজিদের সর্বাপেক্ষা সুদৃশ্য অংশ।

অলংকরণ

মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে খোদাইকৃত পাথর, ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের গিল্টি ও চকচকে টালি ব্যবহূত হয়েছে। তবে এগুলির মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে খোদাইকৃত পাথর। ক্রাইটন ও কানিংহাম মসজিদটির ছাদের উপর পনেরোটি গম্বুজ ও খিলান ছাদের সবগুলিই গিল্টি করা দেখতে পান। কিন্তু বর্তমানে গিল্টির কোনো চিহ্ন নেই।




ছোট সোনা মসজিদ। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


পাথর খোদাইয়ের নকশার ধরন নির্বাচন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিসরের উপযোগিতা অনুযায়ী। যেমন, প্যানেলের কিনারগুলিতে করা হয়েছে লতাপাতার নকশা এবং এদের অভ্যন্তরভাগে হিন্দু আমলের শিকল ও ঘণ্টার মোটিফ অনুসরণে বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্তরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। খিলানের স্প্যান্ড্রিল ও ফ্রেমের উপরের স্থানগুলি আকর্ষণীয় অলংকরণরীতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে খোদাই করা গোলাপ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। গম্বুজও খিলান ছাদের অভ্যন্তরভাগ পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অলংকৃত; তবে খিলান ছাদের অলংকরণ করা হয়েছে স্থানীয় কুঁড়েঘরের বাঁশের ফ্রেমের অনুকরণে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় অলংকরণ হলো কোণের বুরুজের খোদাইকৃত পাথরের বেষ্টনী এবং দ্বারপথ ও ফ্রেমের উপরে বসানো পাথরের কার্নিশ ও অলংকরণ রেখা। উল্লেখ্য যে, সম্মুখের সবগুলি খিলানপথ ও মিহরাবের খিলানগুলি ছিল খাঁজবিশিষ্ট এবং এগুলি অনেকাংশে এ মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল। মসজিদের প্রবেশদ্বারের মতোই পূর্বদিকের ফটকে একসময় বিভিন্ন নকশা খোদাইকৃত প্রস্তর ফলকের আস্তরণ ছিল। কিন্তু এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত কিছু গোলাপ নকশা ছাড়া এসব অলংকরণের তেমন কিছুই এখন আর নেই।


সমাধি

ফটকের ১৪ দশমিক ৫ মিটার পূর্ব দিকে একটি পাথরের প্লাটফর্ম রয়েছে যার আয়তন উত্তর দক্ষিণে ৪ দশমিক ২ মিটার, পূর্ব পশ্চিমে ৬ দশমিক ২ মিটার এবং উচ্চতা ১ মিটার। এর চার কোণে রয়েছে একটি করে প্রস্তর স্তম্ভ। প্লাটফর্মের উপরে উত্তর দক্ষিণে লম্বা পাশাপাশি দুটি সমাধি রয়েছে। সমাধি দুটিতেই ভিত থেকে চতুষ্পার্শ্বে কালো পাথরে নির্মিত কয়েকটি ঊর্ধ্বমুখী আয়তাকার ধাপ আছে এবং এ ধাপসমূহের পরিধি উপরের দিকে ক্রমশ হ্রাস হয়ে এসেছে।




ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


দুটি সমাধিতে রয়েছে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর কয়েকটি নাম সম্বলিত অগ্রভাগ সরু পিপাকৃতির পাথরের সমাধিফলক। এখানে কারা সমাহিত আছেন তা সঠিক জানা যায় নি। কানিংহাম সমাধি দুটিকে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহম্মদ ও তার পিতা আলীর বলে মনে করেন।  

নাবিলা বুশরা   এস এম