এঞ্জেল ফলস : পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : এটি পৃথিবীর সবচেয়ে উচু জলপ্রপাত

এটি ভেনেজুয়েলার ‘কানাইমা ন্যাশনাল পার্ক’ এ অবস্থিত ‘আয়ুয়ান তেপুই’ পর্বত থেকে সৃষ্ট। অ্যাঞ্জেল ফলসের উচ্চতা ৩ হাজার ২১২ ফিট বা ৯৭৯ মিটার। এই এঞ্জেল ফলস উচ্চতায় প্রায় ৩২১ তলা বিল্ডিংয়ের সমান। 'আয়ুয়ান তেপুই' থেকে এই এঞ্জেল ফলসের পানি অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়ছে । এই নামের অর্থ বেশ মজার। মানে হলো 'শয়তানের পাহাড়'। স্থানীয় ভাষার 'আয়ুয়ান' শব্দের ইংরেজি অনুবাদ করলে দাঁড়ায় 'ডেভিল' আর 'তেপুয়' মানে 'মাউন্টেইন'। বিশ্বজুড়ে এই জলপ্রপাতটি অ্যাঞ্জেল ফলস হিসেবে পরিচিত হলেও এর আরও অনেকগুলো নাম আছে। যেমনটা স্প্যানিশ ভাষায় এর নাম হচ্ছে 'সালতো এঞ্জেল'।
এঞ্জেল ফলস ও 'কেরেপাকুপাই ভেনা'
স্থানীয় লোকজন 'পেমন' ভাষায় এই জলপ্রপাতটিকে ডাকে 'কেরেপাকুপাই ভেনা' নামে, যার মানে হলো 'গভীরতম স্থানের জলপ্রপাত'। এছাড়া এই পেমন ভাষায়ই আবার এঞ্জেল ফলসকে ডাকা হয় 'পারাকুপা ভেনা' নামে। যার মানে দাঁড়ায় 'সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত'। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরবচ্ছিন্ন জলপ্রপাত হিসেবে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে জায়গা করে নিয়েছে এই জলপ্রপাতটি। সবার জানা মতে যে, কোনো জলপ্রপাতের উৎস হচ্ছে কোনো নদী, হ্রদ, বরফগলা পানির স্রোত অথবা মাটির নিচ থেকে উঠে আসা পানি। অবাক করা ব্যাপার হলো এই জলপ্রপাতটির পানির প্রবাহের সেরকম কোনো উৎসই নেই। রেইনফরেস্ট অঞ্চলে সারাবছর যে বৃষ্টিপাত হয়, সেই বৃষ্টির পানি পাহাড় থেকে অনবরত গড়িয়ে পড়ে সৃষ্টি করেছে এই বিশাল জলপ্রপাতের। প্রায় এক কিলোমিটার উঁচু থেকে এই বৃষ্টির পানি গিয়ে পড়ে নিচের 'কেরিপ' নদীতে। সেখান থেকে আবার তা গিয়ে মেশে 'চুরুন' নদীতে। আরও মজার ব্যাপার হলো এতো উঁচু থেকে পড়া এঞ্জেল ফলসের বেশিরভাগ পানিই নিচে পড়ার আগেই বাষ্প হয়ে যায়। আর এই বাষ্পই জলপ্রপাতটির চারিদিকে একটা কুয়াশার আস্তরণ তৈরি করে যা এই জলপ্রপাতটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।সবচাইতে জোরালো গর্জণটি
এই জলপ্রপাতের পতনের শব্দের কাছে পৃথিবীর সবচাইতে জোরালো গর্জণটিও যেনো তুচ্ছ মনে হবে আপনার কাছে। বিশাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দও এটির কাছে হার মেনে যায়। এই জলপ্রপাতের চুড়া মেঘের চেয়েও উপরে। দেখে মনে হয় যেনো এই জলধারা স্বর্গ থেকে নেমে আসছে। আশ্চর্য সুন্দর এই জলধারাকে ঘিরে তৈরি হয় রঙধনু। এ যেন অপ্সরীর রূপের অমৃতধারা। আসলেই এর নামের সার্থকতা এর সৌন্দর্যে। এর রূপ, সৌন্দর্য, বিশালতা এমনই যা যে কাউকেই মন্ত্রমুগ্ধ করে দুর্নিবার আকর্ষণে। এই জলপ্রপাতটির নামকরণ করা হয়েছে জিমি ক্রাওফোর্ড এঞ্জেল এর নামানুসারে। তার এই জলপ্রপাত আবিষ্কারের ঘটনাটি কোনো মুভির চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৩৭ সালে জিমি এঞ্জেল ভেনেজুয়েলায় গিয়েছেন সোনার খনি খুঁজতে।তিনি ছিলেন একজন মার্কিন বিমানচালক। তিনি ভেনেজুয়েলার আওয়ানতেপুই এলাকাতে বিমানে করে ঘুরছিলেন। তিনি, তাঁর স্ত্রী আর তাঁর দুই বন্ধু আওয়ানতেপুই পাহাড়ে অবতরণ করলেন। আর সেখানেই তারা আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটিকে। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার সময় তারা পড়লেন বিপদে। কোনোভাবেই জিমি তার ছোট্ট বিমানটি ওড়াতে পারলেন না। শেষে উপায় না দেখে পায়ে হেঁটেই তারা ফিরে আসার যাত্রা করলেন। এক টানা এগারো দিন ধরে হেঁটে নানা বিপত্তির মধ্যে এই ভয়ানক জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তারা অবশেষে লোকালয়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপরই সবাই এই জলপ্রপাতটির কথা জানতে পারলো।
হলিউডের বেশ কিছু সিনেমার ছবির দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে এই জলপ্রপাতে। ডিজনির এ্যানিমেটেড মুভি 'আপ' এর একটি দৃশ্যে এই জলপ্রপাতটি দেখা যায়। এছাড়া 'ডায়নোসর' এবং 'পয়েন্ট ব্রেক' নামে মুভিগুলোর কিছু দৃশ্য চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে এই জলপ্রপাতটিতে। এই জলপ্রপাতটি দুর্গম জায়গায় অবস্থিত বলে এখানে যাওয়া অনেকের জন্যই বেশ কষ্টসাধ্য। তারপরও এখানে অনেক পর্যটকদের আগমন ঘটে। এখানে যাওয়ার জন্য আপনাকে পুয়ের্তো ওয়ার্দাজ অথবা সিউদাদ বলিভার বিমানবন্দর থেকে প্রথমে পৌছাতে হবে কানাইমা ক্যাম্পে। সেখানে থেক নদীপথে যেতে হবে এই জলপ্রপাতে। জুন থেকে ডিসেম্বর মাসে নদীতে নৌকা চলার মতো পানি থাকে। এই সময়টি এই জলপ্রপাত দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
রুবাইদা আক্তার এস এম
