ইস্টার আইল্যান্ড : মহাসাগরে বিশালাকার মূর্তির রহস্যঘেরা দ্বীপ
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ইস্টার আইল্যান্ড - কীভাবে আনা হলো বিশাল এসব মূর্তি?

পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্যময় জায়গা রয়েছে যেগুলোতে হয়তো এখনও কারও পা পড়েনি বা যেসব জায়গার মাহাত্ম্য আজও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি। আজ তেমনই একটি জায়গার গল্প বলা হবে। এটি এমনই একটি জায়গা, যেখানে আজ থেকেও প্রায় হাজার বছর আগে তৈরি করা কিছু আধুনিক মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে হাজার বছর আগে সেই জায়গাটি ছিল বিজ্ঞান ও বুদ্ধিতে সমৃদ্ধ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের সম্পর্কে প্রায় অনেক কিছুই জানা যায় না। রহস্যময় এই জায়গাটির নাম ইস্টার আইল্যান্ড। চিলি থেকে ২০০ মাইল পশ্চিমে এই দ্বীপটির অবস্থান। প্রশান্ত মহাসাগরের কাছেই একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ হলো এই ইস্টার আইল্যান্ড দ্বীপটি। ইস্টার নামটি শুনলেই আমাদের মাথায় প্রথমেই আসে ইস্টার সানডে'র কথা। বাস্তবেও কিন্তু ইস্টার সানডের সাথে এই দ্বীপটির যোগসূত্র রয়েছে। বলা হয়, ১৭২২ সালে দ্বীপটি যখন প্রথম আবিষ্কৃত হয় সেদিন ছিল ইস্টার সানডে, আর তাই দ্বীপটির নামকরণ করা হয়েছে ইস্টার আইল্যান্ড নামে। স্থানীয় ভাষায়, এই দ্বীপের নাম রাপা নুই বা বড় রাজা। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো দ্বীপটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তাছাড়া রহস্যেঘেরা এই দ্বীপটির আবিষ্কারের ইতিহাসও চমকপ্রদ।

দ্বীপটির আবিষ্কারকের অনেকটাই অনিচ্ছাকৃত ভুল বলা চলে। ডাচ আবিষ্কারক জ্যাকব রগেবেনকে দায়িত্ব দেয়া হয় বাণিজ্য পথের সুবিধার জন্যে টেরা অস্ট্রেলিয়াস খুজে বের করতে। কিন্তু পথ ভুল করায় আবিষ্কৃত হয়ে পড়ে এই দ্বীপটি। কী আছে এই দ্বীপে যা এটিকে অন্য সব জায়গার চেয়ে আলাদা করে? ভাবুনতো, ২০ টন ওজনের অনেকগুলো মূর্তি কোনো ক্রেন, যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই কীভাবে প্রায় ১৮ কিলোমিটার জায়গা পর্যন্ত আনা হয়েছে! হ্যা, এটিই হচ্ছে এই দ্বীপটির মূল বিশেষত্ব। ইস্টার আইল্যান্ডে রয়েছে কিছু স্ট্যাচু বা মূর্তি।
ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তির ইতিহাস
ধারণা করা হয়, ১২৫০ থেকে ১৫০০ সালের মধ্যে তৈরি করা। এই স্ট্যাচুগুলো পরিচিত মোয়াই নামে। স্থানীয় শব্দ মোয়াই এর অর্থ 'তার অস্ত্বিত্বের জন্য'। মোয়াইগুলো তৈরি করা হয়েছে আগ্নেয়গিরির ছাই বা টাফ, ব্যাসল্ট, রেড রক, স্কোরিয়া, ট্রাকাইট প্রভৃতি পাথর দিয়ে। সবচেয়ে বড় মূর্তিটির উচ্চতা ৩৩ ফুট আর ওজন প্রায় ৮২ টন! মূর্তিগুলোর অবস্থান বেশ রহস্যজনক, কারণ মাটির ওপর সম্পূর্ণ মূর্তি নেই। মাটির ওপর রয়েছে শুধু মূর্তির মাথা। মূর্তির বাকি অংশ রয়েছে মাটির নিচে। ১৯১৪ সালের আগপর্যন্ত মনে করা হতো মূর্তিগুলো শুধুমাত্র দেহহীন মাথানির্ভর।
কিন্তু, ১৯১৪ সালে মাটির নিচে থেকে আবিষ্কার করা হয় মূর্তিগুলোর দৈত্যাকার দেহাবশেষ। ইস্টার আইল্যান্ড জুড়ে প্রায় এরকম ৮৮৭টি মূর্তির খোজ পাওয়া যায়, যদিও বর্তমানে প্রায় ৩৮৪টি মূর্তি রয়েছে। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার একেকটি মূর্তির ওজন প্রায় ২০ টনের সমান। মূর্তিগুলোকে বসানো হয়েছে দেশের ভেতরে মুখ করে।
মূর্তি রহস্য
মনে করা হয়, তারা তখন ভাবতো তাদের এই দ্বীপের বাইরে পৃথিবীতে আর কোন মানুষের বসবাস নেই। তাই তাদের দ্বীপটিকে রক্ষা করতে দ্বীপমুখি করে এই মূর্তিগুলো বসানো হয়েছিল। মূর্তিগুলো সমগ্র এলাকাজুড়েই ছড়িয়ে আছে। তাই কারা এই বিশাল মূর্তিগুলোকে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে বা কীভাবে এত বিশাল মূর্তিগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলো বা কারা এই মূর্তি তৈরি করেছে বা এই নির্মাণশিল্প তারা কিভাবে জানল সেটি আজও অজানা। দ্বীপটি প্রথম যখন আবিষ্কার করা হয় তখনও মূর্তিগুলো সেখানে ছিল আর এইসম্পর্কে দ্বীপটির বাসিন্দারাও আজও কিছু জানে না। তবে, মোয়াইদের এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ২২ সেপ্টেম্বর ও ২০ মার্চ এই দুইদিন আড়াআড়ি করে মোয়াইদের ওপর সূর্যের আলো পড়ে। উল্লেখ্য ২২ সেপ্টেম্বর ও ২০ মার্চ দুইদিনই পৃথিবীতে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য সমান। এই থেকে বোঝা যায় তারা জ্যোতির্বিদ্যায় যথেষ্ট আধুনিক ছিল।
বর্তমানে দ্বীপটিতে পর্যটকদের জন্য কিছুটা কড়াকড়ি নিয়ম জারি করা হয়। কারণ ২০০৮ সালে এক পর্যটক একটি মোয়াইয়ের কান চুরি করে যার ফলশ্রুতিতে তাকে ১৭,০০০ ডলার জরিমানা দিতে হয়। তাই ইস্টার আইল্যান্ডে গেলে সেখানকার সম্পদ এই মোয়াইগুলোর কোন ক্ষতি যাতে নাহয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ইন্দিরা বিশ্বাস এস এম