বিলাসিতা এসেছে সভ্যতার ধারণার শুরু থেকে। প্রাচীন মানুষের জীবনের প্রধান লড়াইটা ছিল টিকে থাকার। জীবনের সব প্রয়োজন তখন টিকে থাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে।
প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে মানুষ শ্রেষ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে শুরু করে। তার কিছু পরে মানুষ গড়ে তোলে সমাজব্যবস্থা, সভ্যতা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ অতি পরিচিত শব্দ বিলাসিতা। একসময় মানুষ খোলা আকাশের নিচেই বাস করলেও এখন সেই অবস্থা নেই বললেই চলে।
বাধ্য হয়ে সমাজের একটা অংশ এখনও খোলা আকাশের নিচেই বাস করে, টিকে থাকার লড়াইতে তারা সবচেয়ে পিছিয়ে।
যারা এগিয়ে আছে তারা বাস করছে ঘরে, যেখানে দেয়ালদিয়ে ঘেরা একটা আশ্রয় আছে, মাথার ওপর ছাদ আছে। আছে নানা আসবাব। এই গণ্ডি থেকেও মানুষ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সমাজে ধনী-উচ্চবিত্তের মানুষেরা বিলাসবহুল আশ্রয় নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
দুনিয়ার বিত্তবান, প্রতাপশালী কিংবা অভিজাত শ্রেনির কারও কারও বাসস্থান সাধারণের কল্পনার বাহিরে।
বিশ্বের সবেচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কে?
এমন প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর নামটাই মাথায় আসার কথা সবার। সবচেয়ে নিরাপদ আবাস্থল ও তারই হবে, এমনটাই স্বাভাবিক।
হোয়াইট হাউজ, ওয়াশিংটন ডিসি,যুক্তরাষ্ট্র
তবে, এখানে কিছুটা ভুল আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিংবা সবচেয়ে ধনী লোক জেফ বেজোস বিশ্বের সবচেয়ে দামী প্রাসাদে বাস করেন না।
রিয়েল এস্টেট ওয়েবসাইট যিলো ডট কমের অনুমান মতে হোয়াইট হাউজের আনুমানিক মূল্য ৪২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি অর্থে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার থেকে কিছুটা বেশি যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাসাদের এক চতুর্থাংশ মূল্য।
ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ ৩টি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাড়ি-র কথা জানানো হবে।
ব্যয়বহুল বাড়ি- বাকিংহাম প্যালেস, লন্ডন
যদিও এই প্রাসাদ খুব দ্রুত বাজারে বিক্রির জন্যে ওঠানো হচ্ছে না, কিংবা এর মূল্য দাঁড় করানোও যাচ্ছে না।
গ্রেট ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রাসাদটিকে তবুও সাধারণত বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বাসস্থান হিসাবে মেনে নেয়া হয়।
মানি ম্যাগাজিন বাকিংহাম প্রাসাদের আনুমানিক মুল্য হিসেবে করেছে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও এই প্রাইসট্যাগটির কিছু অংশ প্রাসাদের রাজকীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে।
এছাড়া এই প্রাসাদটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল অঞ্চল লন্ডনের কেন্দ্র অবস্থিত। যেটি এর এমন দামের কারণ হতে পারে। লন্ডন এমন একটি শহর, যার জমিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিসেবে ধরা হয়।
বাকিংহাম প্রাসাদ, লন্ডন। ছবি : আইটিভি
১৭০৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলেও ১৭০৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য উন্মুক্ত করা হয় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাকিংহাম প্রাসাদ।
প্রায় ৭৭ হাজার বর্গমিটারের বাকিংহাম প্রাসাদে আছে ৭৭৫টি কক্ষ রয়েছে, যার মধ্যে রয়্যাল এবং তাদের অতিথিদের জন্য ৫২টি শয়নকক্ষ, কর্মীদের জন্য ১৮৮টি শয়নকক্ষ, ৭৮টি বাথরুম এবং ৯২টি অফিস রয়েছে। এর সাথে আছে ১৯টি স্টেটরুম যার মধ্যে একটি স্টেট ডাইনিং রুম, একটি মিউজিক রুম এবং রাজসভা এবং একটি সিংহাসনের ঘর আছে।
বাকিংহাম প্রাসাদের বলরুম হ'ল সাম্প্রতিক সংযোজন।
১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সমাপ্তির উদযাপনের জন্য রানী ভিক্টোরিয়া এই বলরুম নির্মাণ করিয়েছিলেন। প্রাসাদে প্রায় ৪০একর জায়গা জুড়ে বাগান রয়েছে।
তবে, একটি মজার ব্যাপার হলো বিশ্বের অনেক দেশের মালিক হওয়া সত্বেও এই প্রাসাদের মালিক কিন্তু রানী নয়; এটি ট্রাস্টের মালিকানায় আছে।
তবে, চিন্তার কিছু নেই, ব্রিটিশ রানীর কখনও গৃহহীন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। স্কটল্যান্ডের সুদৃশ্য বালমোরাল ক্যাসলসহ তার রয়েছে আরও কিছু রাজকীয় প্রাসাদের মালিকানা।
বালমরাল ক্যাসল, স্কটল্যান্ড। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স
ব্যয়বহুল বাড়ি-অ্যান্টিলিয়া, মুম্বাই :
সম্ভবত বিশ্বের ব্যক্তিমালিকানাধীন সবচেয়ে দামী বাসস্থান আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই অবস্থিত।
আনুমানিক প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অ্যান্টিলিয়া একটি ৪ লাখ বর্গফুটের ২৭-তলার ম্যানশন। বাংলাদেশি অর্থে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এই বাড়িটার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ২০১০ সালে।
বাস্তবে এই বাড়িকে ২৭তলার একটি ভবন বলা খুব একটা ন্যায়বিচার হবে না। ৫৭০ ফুট উচ্চতার বাড়িটি ৫০-৬০তলা বিল্ডিংয়ের সমতুল্য।
অফবিট নকশার হওয়াতে এর সহজ বর্ণনাকে অস্বীকার করে। মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস এটিকে ‘আ ব্লেড রানার-মিটস-ব্যাবিলন এডিফাইস’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।
অ্যান্টিলিয়া, মুম্বাই। ছবি : সংগৃহীত
আটলান্টিক মহাসাগরের একটি পৌরাণিক দ্বীপের নামানুসারে নির্মিত এই প্রাসাদটি হ'ল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির মালিকানায়।
দ্য গার্ডিয়ানের মতে, এর সুবিধাদির মধ্যে তিনটি হেলিপ্যাড, একটি ৫০ আসনের সিনেমা থিয়েটার এবং ছয় তলা পার্কিং স্পেস রয়েছে যাতে ১৬৮টি গাড়ি রাখা যায়। এই সমস্ত কিছু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য, আম্বানি ৬০০ কর্মী নিযুক্ত করেছেন।
এই ফরাসি রিভিয়েরা এস্টেটটির নাম বেলজিয়ামের দ্বিতীয় রাজা লিওপোল্ডের নামানুসারে, যিনি ১৮৯০ এর দশকের শেষদিকে এই সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেছিলেন। তারপর থেকে এর মালিকানায় অনেক রদ-বদল এসেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক হাসপাতাল হিসেবে একে কাজে লাগানো হয়েছে, ক্লাসিক ব্যালে ফিল্ম ‘দ্য রেড সু’ তে উপস্থিত হয়েছিল এবং সম্ভবত আলফ্রেড হিচককের ‘টু ক্যাচ আ থিফ’-এও এর উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে এর মালিক বিলিয়নিয়ার ব্যাংকার এডমন্ড সাফরার সমাজসেবী বিধবা স্ত্রী লিলি সাফার ।
ভিলা লিওপোল্ডা, ভেল্লিফ্রাঞ্চে-সুর-মের, ফ্রান্স। ছবি : সংগৃহীত
প্রায় ২৯ হাজার বর্গফুটের মূল বাড়িতে ১১টি শোবার ঘর, ১৪টি বাথরুম রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও দুটি গেস্ট হাউস, একটি পুল, এবং প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে গাছ এবং বাগান রয়েছে। যার পরিচর্যার জন্য ৫০জন মালি সারাদিন ব্যস্ত থাকে। এর সাম্প্রতিক মূল্য অনুমান করা হয়েছে ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি অর্থে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।