আইফেল টাওয়ার : ভালবাসার শহরের আকাশচুম্বী টাওয়ারের ৫টি চমকপ্রদ তথ্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আইফেল টাওয়ার : এই টাওয়ার নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন ফরাসী বুদ্ধিজীবীরা



আইফেল টাওয়ার

আইফেল টাওয়ার, ফ্রান্স। ছবি : সংগৃহীত


 ভালবাসার শহর প্যারিসে বিশ্বের অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক পরিকাঠামো আইফেল টাওয়ার ‘ল্য ট্যূর আইফেল’ নামেও পরিচিত। নির্মাণ প্রকৌশলী আলেক্সান্দ্রে গুস্তাভো আইফেলের কোম্পানি নির্মাণ করেন ফ্রান্সের কালজয়ী এই টাওয়ারটি যা বার্ষিক প্রায় সত্তর লক্ষ জনসাধারণের দ্বারা পরিদর্শিত। ঐতিহাসিক ফরাসী বিপ্লবের স্মৃতি হিসেবে শর্তবাষিকীতে ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৮৮৭ সালে প্রতীকি এই মিনারটি তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আর এই কাজের জন্য বিখ্যাত সেতু প্রকৌশলী আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেলকে বেছে নেওয়া হয়েছিলো। গুস্তাভো আইফেল পেটা লোহার খোলা জাফরি দিয়ে ৩০০ মিটার (৯৮৪ ফুট) উঁচু এই নিখুঁত ও চমৎকার মিনারটি নির্মাণ করেন। তার নামানুসারেই মিনারটির নাম রাখা হয়েছিলো ‘আইফেল টাওয়ার’। বিশ্বসেরা স্থাপনা হলেও এই টাওয়ারকে নিয়ে রয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক বেশ কিছু তথ্য। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য আইফেল টাওয়ার সম্পর্কিত তেমন ৫টি তথ্য জানানো হবে।


আইফেল টাওয়ার

আইফেল টাওয়ার, ফ্রান্স। ছবি : আইবি টাইমস



আইফেল টাওয়ারটি একবার হলুদ ছিল

ফ্যাশনেবল শহর হিসেবে প্যারিসের জগতজোড়া খ্যাতি, এমনকি এই খ্যাতি ধরে রাখতে আইফেল টাওয়ারকেও স্টাইল ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে রাখতে হয়। কয়েক দশক ধরে আইকনিক এই টাওয়ারকে বর্ণালী রঙে রাঙিয়ে চেহারা পরিবর্তন করেছে। ১৮৮৯-এ এটি উন্মুক্ত হবার পরে, আইফেল টাওয়ারটি লালচে-বাদামী বর্ণে রাঙানো হয়। এর ঠিক এক দশক পরে টাওয়ারটিকে হলুদ রঙে রাঙানো হয়েছিল। বর্তমান স্টাইলটি গৃহীত হওয়ার আগে টাওয়ারটি হলুদ-বাদামি এবং চেসনাট বাদামি রঙ করা হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালে বিশেষভাবে বাদামী রঙ করা হয়েছিল। প্রতি সাত বছর পর পর চিত্রশিল্পীরা আইফেল টাওয়ারের তারুণ্য ধরে রাখতে ৬০ টন পেইন্ট প্রয়োগ করা হয়।


আলেক্সন্দ্রে গুস্তাভো আইফেল

আলেক্সন্দ্রে গুস্তাভো আইফেল। ছবি : সংগৃহীত



ফরাসী বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের জন্য নির্মিত হয়েছিল

বাস্তিল দুর্গের পতনের ১০০ বছরের বার্ষিকী এবং ফরাসী বিপ্লবের সূচনার স্মরণে ১৮৮৯ সালে এক্সপোজিশন ইউনিভার্সেলে-এর আয়োজকরা তাদের আয়োজিত বিশ্বমেলায় একটা নকশা তৈরির জন্য একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করেছিলেন। ১০৭টি প্রস্তাবের মধ্যে তারা স্থপতি স্টিফেন সৌভেষ্ট্রে এবং ইঞ্জিনিয়ার মরিস কোচলিন এবং এমিল নউগিয়েরের সাথে আইফেলের জমা দেয়া নকশাটি নির্বাচন করেছেন।

চার দশক ধরে এটিই ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম কাঠামো

১৯৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার উন্মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার হিসেবে পরিচিত ছিল ৫৫৫ ফুট উচ্চতার ওয়াশিংটন মনুমেন্ট। ৯৬৮ ফুট উচ্চতার আইফেল টাওয়ার উদ্বোধন হওয়ার পর বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থাপত্যের তকমা দখল করে নেয়। প্রায় চার দশকের শীর্ষ স্থান হারায় নিউ ইয়র্কের ক্রিসলার ভবনের কাছে, এক হাজার ৪৬ ফুট উচ্চতার এই ভবনটি ১৯৩০ সালে নির্মিত হয়েছিল।


আইফেল টাওয়ারের নির্মাণ

আইফেল টাওয়ারের নির্মাণ। ছবি : সংগৃহীত


 তবে, ১৯৫৭ সালে আইফেল টাওয়ারে এন্টেনা সংযুক্ত হলে এটা ক্রিসলার ভবনের উচ্চতাকে টপকে যায়। যদিও বর্তমানে এরচে অনেক উঁচু টাওয়ার নির্মিত হয়েছে তবে আইফেল টাওয়ারের অনন্য স্থাপত্য একে এখনও আগ্রহের শীর্ষেই রেখেছে।

আইফেল টাওয়ার এক সময় বিশ্বের বৃহত্তম বিলবোর্ড ছিল

১৯২৫ থেকে ১৯৩ সালের মধ্যকার সময়টাতে প্যারিসে সন্ধ্যা নামলেই আইফেল টাওয়ার আলোকিত হতে লক্ষাধিক বাল্বের সাহাযে। টাওয়ারের তিনটি অংশের সাথে প্রায় আড়াই লাখ রঙিন বাল্ব যুক্ত করে ফরাসী অটোমোবাইল সংস্থা সিট্রোনের ১০০ ফুটের উল্লম্ব বর্ণগুলো আলোকসজ্জার মাধ্যমে ভেসে উঠতো। বিজ্ঞাপনটি এত উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠত যে প্রায় ২০ মাইল দূর থেকেও এটি দৃশ্যমান ছিল এবং ১৯২৭ সালে ট্রান্স-আটলান্টিক ফ্লাইট যখন প্যারিসে পৌঁছেছিল তখন চার্লস লিন্ডবার্গ এটি বীকন হিসাবে ব্যবহার করেন।




আইফেল টাওয়ারে বিজ্ঞাপন। ছবি : সংগৃহীত



প্যারিসের শিল্পীরা ‘রাক্ষুসে’ কাঠামোটির বিরুদ্ধে আবেদন করেছিলেন

যদিও এখন বিশ্বব্যাপী রোম্যান্সের প্রতীক, আইফেল টাওয়ারের মূল নকশাটি প্যারিসের ৩০০ জন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের হৃদয়ে ভালবাসা ছাড়া অন্য কিছুকে অনুপ্রাণিত করেছিল। যারা ১৮৮৭সালে ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে লে টেম্পস পত্রিকায় প্রকাশিত নিম্নলিখিত ইশতেহারে স্বাক্ষর করেছিলেন। ইশতেহারে ছিল, ‘আমরা, লেখক, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি, সৌন্দর্যের অনুরাগী প্রেমীরা, প্যারিসে এখনও অবধি অক্ষুণ্ণ রয়েছেন, ফরাসী শিল্প ও ইতিহাসের নামে ফরাসি রুচির নামে ভালবাসার শহরের কেন্দ্রে এমন রাক্ষুসে ভাস্কর্য নির্মাণের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি’। ফরাসিদের অভিযোগ ছিল, তাদের রাজধানী প্রাণকেন্দ্রে তাদের নিজস্ব রুচির বিরোধিতা করা এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।


টাওয়ারের রেস্তোরাঁ

আইফেল টাওয়ারের রেস্তোরাঁ। ছবি : সংগৃহীত


তাদের প্রতিবাদের ভাষ্য এমন ছিল যে সাংস্কৃতিক এই শহরে যে দৈত্যাকৃতি এক ধাতব স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়েছে যা খোদ বাণিজ্য মানসিকতার আমেরিকাও চায়না। সেখানে শৈল্পিক মানসিকতার, ভালবাসার শহরের কেন্দ্রে এর নির্মাণে প্রতিবাদ করা হয়। এমনকি আইফেল টাওয়ার নির্মাণকাজ প্রতিবাদের কারনে হুমকিতে পরেছিল। আর আজ এই টাওয়ার ই ফরাসীদের কাছে ভালবাসার প্রতীক, যা আজকে বিশ্বের ভালবাসার এক নিদর্শন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ফ্রান্সের এই টাওয়ার পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করেছে। টাওয়ারের ভেতরে অবস্থিত দুটি রেস্তোঁরা হলো লা ৫৮ ট্যুর আইফেল এবং লা জুল ভার্ন। আইফেল টাওয়ার একটি বিশ্ববিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক, যেটি প্যারিসের প্রায় সমগ্র জায়গা থেকে দেখা যেতে পারে। আইফেল টাওয়ারে আছে একটি সংবাদপত্র অফিস, পোস্ট অফিস, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ও একটা থিয়েটার। আইফেল টাওয়ারের প্রথম তলাটি প্রত্যেক বছর আইস রিংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


আইফেল টাওয়ার

আইফেল টাওয়ার। ছবি : সংগৃহীত


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই টাওয়ারটি বেতার তরঙ্গ সম্প্রচার করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্যারিসে নাৎসি বাহিনীর আগমনের আগে এর লিফটের তার কেটে দিয়েছিল মিত্র বাহিনী। নাৎসিরা যেন টাওয়ারটি ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্যই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। তবে মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা ফিরে আসার পরে সেটি আবার ঠিক করা হয়েছিল।  

নাবিলা বুশরা   এস এম