অজন্তা গুহা : বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে যেখানে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: বৌদ্ধ ধর্মের শত শত শৈল্পিক নিদর্শনের সাক্ষী অজন্তা গুহা


ajanta cave অজান্তা গুহা

গভীর জঙ্গলের ভেতর লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকা গুহাটি আবিষ্কৃত হয় ১৮১৯ সালে; ছবি : উইকিপিডিয়া


প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে ভালোলাগা কাজ করে অথচ অজন্তা গুহার নাম শোনেনি এমন ব্যক্তি বোধহয় পাওয়া যাবে না। ভারতের মহারাষ্ট্রেই রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন অজন্তা গুহা। মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদ শহর থেকে ১০২ কিলোমিটার উত্তরে অজন্তা নামক স্থানেই দেখা পাওয়া যায় অজন্তা গুহার। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই গুহাটি গড়ে ওঠে।

ইতিহাস

জঙ্গলের সবুজের প্রাচীর ভেদ করে ১৮১৯ আবিষ্কৃত হয় অজন্তা গুহা। অনেকটা কেঁচো খুড়তে গিয়ে কেউকেটা বের করে আনার মতো। ব্রিটিশ কর্মচারী ও পর্যটক জন স্মিথ জঙ্গলে বাঘ শিকার করতে গিয়ে পেয়ে যান অজন্তা গুহার খোজ। পরে তারই নেতৃত্বে মাটি খুড়ে পাওয়া যায় প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন অজন্তা গুহা।

আরও পড়ুন : কান্দোভন : পাথরের গুহার ভেতরেই শতবর্ষী ঐতিহ্যের যে গ্রাম

অজন্তা গুহায় বৌদ্ধধর্মের অনেক নিদর্শন দেখা যায়। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর ভ্রমণ লিপিতেও অজন্তা গুহার কথা বলা আছে। সবমিলিয়ে অজন্তা গুহা হয়ে ওঠে এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। দেয়ালে ধর্মীয় লিখন, গুহাচিত্র, মূর্তি এবং প্রায় ৩০টি মূর্তি সংবলিত অজন্তা গুহা প্রাচীনকালের বৌদ্ধধর্মের শৈল্পিক নিদর্শনের সাক্ষী।

ajanta cave অজান্তা গুহা

গুহার ভেতর কার দৃশ্য; ছবি : উইকিপিডিয়া


ওয়াঘোরা নদীর তীরবর্তী পর্বতের পাথর কেটে অজন্তা গুহায় থাকা মন্দির গুলো তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরগুলো দু'টি ভাগে বিভক্ত; চৈত্য এবং বিহার। চৈত্য হলও সন্ন্যাসীদের থাকার জায়গা; আর বিহার হলও সন্ন্যাসীদের উপাসনার স্থান। ধারণা করা হয় ৩০টি মন্দিরের মধ্যে পাঁচটি ব্যবহৃত হত চৈত্য হিসেবে; এসব চৈত্যে প্রায় দুশো সন্ন্যাসী থাকতো বলে মনে করা হয়। বাকি ২৫টি ব্যবহার করা হতো বিহার বা উপাসনার স্থান হিসেবে।

ভাস্কর্য ও লিপিকর্ম

প্রায় নয়শ বছর ধরে অজন্তা গুহার ছবিগুলো তৈরি ও আঁকা হয়েছে। তারপর প্রায় এগারোশো বছর অজন্তা গুহা যেন নির্বাসনে ছিল। আর সবশেষে যখন দুশো বছর আগে অজন্তা আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হলও তখনো অজন্তার বিশটি গুহার ভেতর অক্ষত ছবি পাওয়া গেছে। তারপরের দুশো বছর শেষে অজন্তায় ছয়টি ছবি অক্ষত পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন : ক্রুবেরা,জর্জিয়া: পৃথিবীর অন্যতম গভীরতম গুহা

গুহার দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের জীবনী, যেসব রাজপুত্র সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করতে যেতো তাদের জীবনী, বিভিন্ন পশু-পাখি এমনকি নর-নারীর প্রেমের দৃশ্যও অঙ্কিত আছে। ছবিগুলো বেশিরভাগই জাতকের গল্প নিয়ে। এক নম্বর গুহার দেওয়ালে শঙ্খপাল জাতকের গল্প৷ তেমনই আরও আছে, মহাজনক জাতক, শিবি জাতক, চম্প্যেয় জাতক ৷

ajanta cave অজান্তা গুহা

কয়েকশ বছর আগে খোদাই করা মূর্তি এবং অঙ্কিত বিভিন্ন ছবি দেখতে পাওয়া যায় গুহার দেয়ালে; ছবি : উইকিপিডিয়া


এছাড়া রয়েছে বেশকিছু ভাস্কর্য,মনে করা হয় ভাস্কর্যগুলো ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্যের উজ্জ্বলতম নিদর্শন হিসেবে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ছবিগুলো যে শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক তুলে ধরে তাই নয়, গবেষকদের মতে ছবিগুলোর মধ্যদিয়ে গ্রিক-ভারতীয় সংস্কৃতির বিষয়টিও উঠে আসে। ১৮৮৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের তালিকায় জায়গা পায় অজন্ত গুহার নাম। মনে করা হয়, ভারতের বিখ্যাত স্থাপনা তাজমহলের পর পরেই পর্যটক আকর্ষণের দিক থেকে অজন্তা গুহা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

আরও পড়ুন : ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : এশিয়া মহাদেশ (ভারতীয় উপমহাদেশ)

অজন্তার পাশেই রয়েছে সভ্যতার আরেক প্রাচীন নিদর্শন ইলোরা গুহা। অজন্তা গুহা যেমনি করে লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল, ইলোরাতে তেমনটি ঘটে নি। ইলোরা সবসময়ই মুখরিত ছিল পর্যটকদের আনাগোনায়। ইলোরাও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইলোরাতে ৩৪টি গুহা পাওয়া যায়, যার সবগুলোই পাহাড় কেটে নির্মাণ করা। ইলোরার মন্দিরগুলো হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বিশ্বের তিনটি ধর্মের নিদর্শন এক ইলোরাতে রয়েছে। এই চিত্রই বুঝি আমাদের জানান দেয় যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভীত আমাদের কত মজবুত।

ইন্দিরা বিশ্বাস   এস এম


Click Here To See More