ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট (এশিয়া পর্ব) : সিরিয়া-ইরাক-এর ঐতিহ্য
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আজকের সিরিয়া এবং ইরাক-এর ধ্বংসস্তুপ একসময়ের সমৃদ্ধ নগরী ছিল

পালমাইরা (সিরিয়া)
প্রাচীন শহর পালমাইরা একসময় ছিল সিরিয়ার সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র। পালমাইরা শহরটি সিরিয়াতে ইসলামের আগমনেরও অনেক পূর্ব থেকেই বজায় ছিল। এমনকি প্রাচীন নথিপত্র অনুযায়ী খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকেই সিরিয়া কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্যের মূল ছিল পালমাইরা শহরটি। প্রাচীন এই শহরটি এতটাই পরিচিত ছিল যে এর কথা স্বয়ং বাইবেলেও উল্লেখিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মে মাসে এই অঞ্চলটি চলে যায় আইএস-এর দখলে। চরমপন্থীরা এই অঞ্চলের 'বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক প্রাচুর্য ধ্বংস করতে চায়' মর্মে সে সময়ের ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বকোভা বলেছিলেন, 'পালমাইরা শহরের সংস্কৃতি এবং অবকাঠামো বেশ কিছুর সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু বলে বিবেচিত। এটি সিরিয়ার নিজস্ব পরিচয় এবং ইতিহাস প্রাচুর্যতার একটি স্মারক হিসেবে চিহ্নিত'। বর্তমানে পালমাইরা শহরের যা অবশিষ্ট আছে তা মূল ঐতিহ্যের দেহাবশেষ বলা চলে।
হাত্রা (ইরাক)
ইরাকের দূর্গ শহর হাত্রা। প্রাচীন এই শহরটির জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ২য় কিংবা ৩য় শতকে। পরবর্তীতে এই শহরটিই হয়ে যায় প্রথম আরব সাম্রাজ্যের রাজধানী। আগেই যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, হাত্রা মূলত ছিল একটি দূর্গ শহর। এর বিশাল দেয়ালগুলো শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। সভ্যতার উর্বরভূমি ইরাকে মেসেপোটেমিয়ান যুগে এসব স্থাপনা গড়ে ওঠে। আর দেয়ালগুলোতে প্রাচীন রোমান এবং পার্সিয়ান সভ্যতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।

আশুর (সিরিয়া)
এটি সিরিয়ান আরেকটি প্রাচীন শহর যা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি। যদিও বর্তমানে এটি ইরাকের ভৌগলিক অঞ্চলে অবস্থিত তবে ২০০৮ সালে ইউনেস্কো এটিকে সিরিয়ান বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আশুর শহরটি আজ থেকে প্রায় ৩,০০০ বছর আগের একটি শহর। পরবর্তীতে শহরটি অ্যাসিরিয়ান সভ্যতার প্রথম রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। বলা হয়, মেসেপোটেমীয় সভ্যতার দেবতা আশুরের সহয়তায় নির্মিত হয়েছিল। যার কারণে শহরটির নামই হয়ে পড়ে আশুর। ধর্মীয়ভাবে সেই সময় শহরটির কদর ছিল অসামান্য। টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটির বর্তমান নাম কালাত শেরকাত।
আলেপ্পো (সিরিয়া)
টিভি পর্দায় সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞের খবর পেয়ে থাকলে এই শহরের নাম আপনার কাছে খুবই পরিচিত হবার কথা। আলেপ্পো নামের এই ঐতিহাসিক শহরটি সিরিয়ার রাজধানী না হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এবং ২০১২ সাল থেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার যতটা সমগ্র সিরিয়া হয়েছে তাঁর একটি বড় অংশের ক্ষত বহন করেছিল এই শহরটি।

প্রত্নতাত্ত্বিক শহর সামারা (ইরাক)
ইউনেস্কো একে বর্ণনা করেছিল, 'মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী টিকে থাকা একমাত্র ইসলামিক শহর। যেখানে স্থাপত্যশিল্প এবং শিল্প যেমন মোজাইক এবং খোঁদাইশিল্প একেবারেই মূল পরিকল্পনার অনুরূপ।' এই প্রত্নতাত্ত্বিক শহরের নাম সামারা। ইরাকে অবস্থিত এই শহরের গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল তা সঠিক জানা না গেলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলামী স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত আব্বাসীয় শাসনামলে এটি ছিল রাজধানী।
দামেস্কাস (সিরিয়া)
সিরিয়ার এই রাজধানী শহরটিও মুক্তি পায়নি আগ্রাসনের হাত থেকে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন কিছু শহরের মাঝে একটি। এবং কিছু কিছু নিদর্শন থেকে জানা যায়, যীশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার বছর আগে থেকেই এই শহরটি বর্তমান ছিল।
বসরা (সিরিয়া)
ইসলামের ইতিহাসে সিরিয়ার এই বসরা নগরীর তাৎপর্য একেবারেই অন্যরকম। বাজেন্টাইন কিংবা উমাইয়া শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর বলেই না, বরং রোম শাসিত আরবাঞ্চলের রাজধানীও ছিল প্রাচীন বসরা শহর। এই শহরে এখনও খ্রিস্টীয় ২য় শতকে স্থাপিত রোমান থিয়েটারের নিদর্শন বর্তমান রয়েছে।
সিরিয়া গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই শহরের দখল নেয়া বিবাদমান পক্ষগুলোর জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। যার কারণে মূলত ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে শহরের সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। ২০১২ সাল থেকেই নিয়মিত এই শহরে বোম এবং শেল আছড়ে পড়ার ভয়ানক ভিডিও ইন্টারনেট জগতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এসময় শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী জিনিসের লুট হবার ঘটনাও উঠে এসেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী হলেও মানুষের ভেদাভেদেই হারিয়ে যাচ্ছে, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। কোন একদিন এইসব জনপদে বোমার শব্দ থেমে পর্যটকের ক্যামেরার শাটার পড়ার শব্দ হবে, আপাতত প্রার্থনা ওতটুকুই।
জুবায়ের আহম্মেদ এস এম