নয় গম্বুজ বিশিষ্ট সাতৈর মসজিদ, ফরিদপুর

কুমার নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থান সাতৈর মসজিদ


সাতৈর মসজিদ

ছবি : সংগৃহীত


শত বছর পূর্বের জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ফরিদপুর জেলা ঢাকা বিভাগের একটা প্রশাসনিক অঞ্চল। সুফি সাধক শেখ ফরিদুদ্দিনের নামে নামকরণকৃত এই জেলাটির পূর্ব নাম ফতেহাবাদ। কুমার নদীর তীরে অবস্থিত এই জেলাটিতে রয়েছে নানান ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থান। সাতৈর মসজিদ এখানকার তেমনই একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কর্তৃক ষোল শতকে নির্মিত হয় এই মসজিদটি। নয় গম্বুজ বিশিষ্ট সাতৈর মসজিদ ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার উত্তরাংশে সাতৈর গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটি ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়া-মধুখালী রেললাইনের ঘোষপুর স্টেশনের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত। ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাংক রোড বা শের শাহ সড়ক-এর পাশ ঘেঁষেই অবস্থিত মসজিদটি। মসজিদটি গায়েবি মসজিদ নামেও পরিচিত।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাঁর কোনো এক পীরের সম্মানেই এই মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে ধারণা করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে একদা জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায়। বিশ শতকের শুরুর দিকে আবিষ্কৃত হওয়ার পর মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। যা মসজিদটিকে এক নতুন রূপ দেয়। দেয়ালের গায়ে সিমেন্ট ও বালির আস্তরণ দিয়ে এতে লাল রং করা হয়েছে প্রাচীন ইতিহাস তুলে ধরতে। এর পূর্ব দিকে টিন-আচ্ছাদিত একটি সম্প্রসারিত অংশও যোগ করা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদটির চেহারা দেখে একে আর প্রাচীন ইমারত বলে কারও মনে হয় না। অথচ এটি সেই সুলতানি আমলের স্মৃতি বহন করছে।


সাতৈর মসজিদ

বর্গাকার এই মসজিদের প্রতি দিকের পরিমাপ বাইরের দিক থেকে প্রায় ১৭ দশমিক ৮ মিটার এবং ভেতরের দিকে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ মিটার। শুরুতে এর পশ্চিম দিক ব্যতীত মসজিদটির বাকি তিন দিকেই তিনটি করে প্রবেশপথ ছিল। তবে বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথগুলিকে জানালায় রূপান্তর করা হয়েছে। প্রবেশপথগুলোর খিলানকে যদিও ছোট মনে হয়, কারণ মসজিদটির মেঝে আশপাশের ভূমি থেকে প্রায় দশমিক ৬ মিটার নিচু। এই মেঝের প্রায় দশমিক ৭৬ মিটার নিচে ছিল এর পুরাতন মেঝে। নয়টি কন্দাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত মসজিদটি। মসজিদের ভেতরে স্থাপিত পাথরের তৈরি চারটি স্তম্ভও রয়েছে। দেয়াল এবং দেয়ালের গায়ে মোট ১২টি সংলগ্ন স্তম্ভ এই গম্বুজগুলির ভার বহন করছে। গম্বুজ নির্মাণে প্রাচীন পেন্ডেন্টিভ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে বহু-খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি মিহরাব রয়েছে। যার মধ্যে কেন্দ্রীয়টি অপেক্ষাকৃত কিছুটা বড়।

মসজিদটির উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১৫ মিটার দূরে একটি গভীর কূপ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রয়েছে ধাপযুক্ত প্লাটফর্মের উপর স্থাপিত একটি সমাধি, আর পশ্চিমে রয়েছে একটি দিঘি। এর মধ্যে বেশির ভাগই পরে তৈরি করা হলেও এসবই এই মসজিদটিকে অসাধারণ করে তুলেছে। বাংলাদেশের অন্যান্য প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার মতো এই মসজিদের সাথেও জড়িয়ে আছে নানা কল্পকাহিনী। মসজিদের বয়সের সাথে সাথে এই কিংবদন্তিগুলোও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মানুষের মুখে মুখে কিংবা বিশ্বাসে বেঁচে থাকে। বলা হয়ে থাকে, মহান সৃষ্টিকর্তার হুকুমে এক রাতেই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের খুঁটির সাথে বাতাসের আসা-যাওয়াতে সৃষ্ট শব্দকে অন্যকে এদের হাসি কান্না বলে ও বিশ্বাস করেন। এছাড়াও মসজিদে কিছু মানত করলে নি:সন্তানদের সন্তান হয় যেমন তেমনই মসজিদের ধূলা গায়ে মাখলেও নাকি রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলি থেকে সরাসরি বাসে ফরিদপুর যাবেন।জেলার মাঝকান্দি লোকাল বাস স্ট্যান্ড থেকে ফরিদপুর-বোয়ালমারী মহাসড়ক হয়ে কাঙ্খিত সাতৈর মসজিদ।  

সাখাওয়াত নিশান   এস এম