যমুনা সেতু : বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু যেন পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বাংলাদেশের বৃহত্তম সেতুবন্ধ বলা হয় বঙ্গবন্ধু সেতুকে

Jamuna_Bridge বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু, টাঙ্গাইল। ছবি : উইকিপিডিয়া

প্রমত্তা যমুনার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বহুল পরিচিত যমুনা বহুমুখী সেতু কিংবা যমুনা সেতু, বর্তমানে যেটি ‘বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু’ নামে পরিচিত  এর নাম শুনে নাই এমন বাঙ্গালী খুজে পাওয়াটা মনে হয় কষ্টসাধ্যই হবে। দেশের পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলকে সংযুক্ত করা এই বিশাল স্থাপনা আমাদের অর্থনীতির জন্যে বয়ে এনেছে অনেক সাফল্য। ট্রেনে করে দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকা কিংবা উত্তরবঙ্গ যাওয়ার পথে এই সেতু পার হতেই হবে।

অনেকবার এই সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত হলেও এর নেপথ্যের তথ্য কতটুকু জানি আমরা ? চলুন জেনে আসা যাক দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার এই যমুনা সেতুর অতীত এবং বর্তমান। বিশাল যমুনা নদীর উপর দিয়ে সেতু স্থাপনের মাধ্যমে গোটা দেশের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের আকাঙ্খা ভারতীয় উপমহাদেশের এই অংশের জনগণের দীর্ঘকালীন স্বপ্ন ছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম ১৯৪৯ সালে মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রাজনৈতিক পর্যায়ে যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি উত্থাপন করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচন ইশতেহারে যমুনার বুকে এই সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ থাকলেও এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখতে পায় অনেক চড়াই-উতরাই পার হবার পরে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যমুনা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে এজন্য বরাদ্দ রাখা হয়।

বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭৩ সালে জাপান ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা যমুনা নদীর উপরে একটি সড়ক কাম রেলসেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হাতে নেয়। ১৯৭৬ সালে তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী যমুনা সেতু প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় হবে ৬৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং যাতে অর্থনৈতিক আগমের হার দেখানো হয় মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে যা লাভবান না হওয়ায় তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে।jamuna bridge সড়ক যোগাযোগব্যাবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে এই সেতু। ছবি : যুগান্তর

দেশের ৩টি বৃহত্তম নদীর মধ্যে একটি এবং পানি নির্গমনের দিক থেকে বিশ্বে পঞ্চম যমুনা নদীর ওপর অবস্থিত 'বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু' একটি সড়ক এবং রেলসেতু। যমুনা নদীর পূর্ব তীরে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা এবং পশ্চিম তীরের সিরাজগঞ্জ জেলাকে সংযুক্ত করে এই সেতু বাংলাদেশের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগ প্রতিষ্ঠা করেছে।

১৯৯৮ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হবার পর থেকেই এই সেতু আভ্যন্তরীণ পণ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের জনগণের জন্যে বহুবিধ সুবিধা বয়ে এনেছে। সড়ক এবং রেলপথে দ্রুত যাত্রী এবং মালামাল পরিবহন ছাড়াও এই সেতু বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন এবং টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থার অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সেতু দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও রেখেছে অবিস্মরণীয় অবদান।

সম্ভাব্য সব ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষত ভূমিকম্প সহনশীল করে তোলার লক্ষ্যে সেতুটিকে ৮০-৮৫ মিটার লম্বা এবং ২ দশমিক ৫ ও ৩ দশমিক ১৫ মিটার ব্যাসের ১২১টি ইস্পাতের খুঁটির ওপর বসানো হয়েছে। এই খুঁটিগুলি খুবই শক্তিশালী (২৪০টন) হাইড্রোলিক হাতুড়ি দ্বারা বসানো হয়। সেতুটিতে স্প্যানের সংখ্যা ৪৯ এবং ডেক খন্ডের সংখ্যা ১ হাজার ২৬৩। সেতুটির ওপর দিয়ে ৪ লেনের সড়ক এবং ২টি রেলট্র্যাক নেয়া হয়েছে।

সেতুটির উপরিকাঠামো ঢালাই করা খণ্ডাংশ দিয়ে তৈরি এবং এগুলো সুস্থিত খিলান পদ্ধতিতে বসানো হয়েছে। যমুনা নদীর প্রধান চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটারের বেশি না হওয়া সত্ত্বেও বন্যাজনিত কারণ মাথায় রেখে প্রাথমিকভাবে ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটি সেতুর প্রস্তাব করা হয় যা ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে সেতুর মূল অংশের দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার হিসেবে চূড়ান্ত প্রকল্প পাশ হয়।

২০০৩ সালে সেতু কর্তৃপক্ষ যমুনা বহুমুখী সেতুটি বুঝে নেয়। চুক্তি মোতাবেক ত্রুটির জন্য পরবর্তী ১০ বছর যমুনা সেতুর ত্রুটির সব ব্যয়ভার হুন্দাইকে বহন করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে সেতু সংস্কার কাজে চীনের চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) এবং ২০০৮ সালের মার্চে ফিলিপাইনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাঞ্জেল লাজারো অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডকে ফাটল মেরামত কাজের টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরি ও মেরামত কাজ তদারকির পরামর্শক হিসাবে নিয়োগ করা হয়। Jamuna-Bangabandhu-Bridge-Tangail ছবি : ভ্রমণ গাইড

বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিশাল অংশীদার। স্বাধীনতার পরে এই সেতু নির্মাণ ছিল দেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে বিশাল ধাপ। লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া এই সেতু দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক পর্যটকই ভিড় করেন এখানে।

বিশাল এই স্থাপনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কিছু দৃষ্টিনন্দন অবকাশযাপন কেন্দ্রও। যার মধ্যে 'যমুনা রিসোর্ট'-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুচোখ মেলে দেখে আসতে পারেন পূর্ব-পশ্চিমকে দুই হাতে আগলে ধরে থাকা এই সেতুকে। আরও ঘুরে আসতে পারেন যমুনা রিসোর্ট থেকে। আর টাঙ্গাইল গেলে এর বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচমের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

কিভাবে যাবেন : ঢাকার কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর ষ্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন, চিত্রা, দ্রুতযান, একতা, লালমণি, নীলসাগর ইত্যাদি আরও অনেক ট্রেনে উঠে নামতে পারবেন বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশনে নামতে পারবেন। আসনভেদে ভাড়া পড়বে ১৬০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া বাসে করে আসতে পারবেন টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর উপজেলায়, সেখান থেকে যেতে পারবেন বঙ্গবন্ধু সেতুতে।  


তথ্যসূত্র : mailto:https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%81_%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A7%81 mailto:http://www.tangail.gov.bd/site/top_banner/fab743ff-2011-11e7-8f57-286ed488c766 mailto:https://www.facebook.com/Jamuna.multipurpose.bridge/