সমৃদ্ধ স্থাপত্যে পরিপূর্ণ ভক্তপুর শহর। ছবি : হোপনেপাল
পাহাড়ের কথা শুনলে সবার আগে যে দেশটির নাম সবার আগে মাথায় আসে তা হল আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। যদি তল্পিতল্পা নিয়ে দেশের বাইরে পাহাড়ি মেঘগুলোর সাথে এককাপ চা খেতে চান তাহলে নেপালই হলো সর্বোত্তম জায়গা। কিন্তু দেশটিতে প্রবেশের পরই বুঝতে পারবেন তুষার আচ্ছাদিত হিমালয় ছাড়াও এদেশে এমন আরও অনেক দর্শনীয় স্থান আছে যার টানে বারবার ফিরে যেতে চাইবেন নেপালে। আর প্রতিবার ভ্রমণ শেষে মনে বাজবে-হইয়াও হইলো না শেষ। তেমনই এক শহর ভক্তপুর।
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই শহরটি ছিল প্রাচীন নেপালের রাজধানী। ভক্তপুর ছিল নেপালের প্রাচীন রাজাদের আবাসস্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৪০১ মিটার। ৬ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভক্তপুর দরবার স্কয়ার। স্কয়ারের পুরোটাই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ১২০০ থেকে ১৭০০ শতাব্দী পর্যন্ত নির্মিত মন্দির সংখ্যা ১৭২টি। কাঠ, ধাতু আর পাথরে নির্মিত মধ্যযুগীয় স্থাপত্য ও মূর্তি ভক্তপুরকে পরিয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের মুকুট।
প্রাচীন এ শহরটি মূলত গাড়িমুক্ত। শহরটির আঁকাবাঁকা রাস্তাজুড়ে হাঁটতে গিয়ে দেখতে পাবেন প্রাচীন সব নিদর্শন। যা আপনার ভ্রমণকে আরও মনোরম করে তুলবে। পুরো শহরটি যেন মধ্যযুগীয় শিল্প-সাহিত্য ও কারুকার্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। শহরটির প্রতিটি কোণায় আপনি কয়েকশ বছর পুরানো ধর্মীয় উপাসনালয় দেখতে পাবেন। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ছোঁয়াও এখানে পাওয়া যায়। যদি আপনি নেপালি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী হন তবে নেপাল ভ্রমণে ভক্তপুরে যাওয়া চাই-ই চাই।
নয়া তাপোলা মন্দির। ছবি : নেপাল ট্যুর প্যাকেজ
অগণিত সিঁড়ি ডিঙিয়ে ভক্তপুর দরবার স্কোয়ারের বিশাল প্রবেশদ্বার। বলা হয় কয়েকশ বছর আগে এই প্রবেশদ্বার দিয়েই এই রাজ্যে ঢুকতে হত। স্কোয়ারের আঁকাবাঁকা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করার সময়, আপনার চোখে পড়বে রাস্তার পাশ ঘেঁষা গড়ে উঠা কারুকাজ খচিত অতি প্রাচীন দালানকোঠা। মধ্যযুগীয় রাজ ঘরানার নকশা এবং লাল ইটের বাহারী কারুকার্য আপনায় মন জয় করে নিতে বাধ্য।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে যায় দরবার স্কোয়ার। সেই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে নেপালীদের প্রচেষ্টায়। বর্তমানে মূল মন্দিরের অনেকগুলোই মেরামত ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে, আপনি ভক্তপুরের গোল্ডেন গেট, ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি, তামূধি তোল গেট মতো ইতিহাস সংবলিত স্থানগুলো দর্শন করতে ভুলবেন না কিন্তু।
ভক্তপুরের আকর্ষণীয় স্থাপত্যগুলোর একটি হল নয়া তাপোলা মন্দির। পাঁচ স্তরের বেড়ে ওঠা এই মন্দিরটি দেখতে প্রতিবছর হাজারও পর্যটক এখানে ভিড় জমান। দীর্ঘ সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠতে হবে মন্দিরের উপরে। খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে তৌমাধি স্কোয়ার এবং এর আশেপাশের পাহাড়গুলোর সুন্দর দৃশ্য দেখতে পারেন।
স্থানীয় খাদ্য : নেওয়ারি সাময় ভাজি। ছবি : সংগৃহীত
আপনি যদি নেপালের কিছু প্রচলিত এবং অনন্য খাবার চেষ্টা করতে আগ্রহী হন,তবে ভক্তপুর আপনার সেই ইচ্ছাপূরণের এক দুর্দান্ত জায়গা। খাদ্য হিসাবে এখানে নেওয়ারি সংস্কৃতির ধারা বজায় আছে। এদের মেনুতে রয়েছে প্রাচীন ঘরোয়া খাবার যা নেপালের অন্য কোথাও খুঁজে পেতে আপনাকে বেশ কসরতই করতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো সাময় ভাজি, প্রাচীন খাঁটি নেওয়ারি পদ। অনেকগুলো আলাদা আলাদা পদ একসাথে থালায় পরিবেশন করা হয় সাথে থাকে চাটনি এবং চালের তৈরি পিঠা।
আপনি স্থানীয় দই, জুজু ধাউ, যাকে কিং কর্ড নামেও পরিচিত প্রসিদ্ধ আঞ্চলিক খাবার না খেয়ে আপনি ভক্তপুর ছেড়ে যেতে পারবেন না। এখানকার সুস্বাদু দইটি শহরের চারপাশে ছোট ছোট দোকানে মাটির পাত্রে পরিবেশন করা হয়। মহিষের দুধ থেকে তৈরি, এটি একটি ঘন এবং ক্রিমের স্বাদযুক্ত। বলা হয় এটি নাকি বিশ্বের সেরা দই।
ভক্তপুরে কারুশিল্পের আবাস পটার্স স্কয়ার। ছবি : অ্যালামি
ভক্তপুরের সৌন্দর্য অবশ্যই স্থানীয় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল কারণ শহরটি এখন এক অনন্য কলা ও কারুশিল্পের আবাস। অন্যতম প্রধান কারুশিল্প দেখতে হলে দরবার স্কোয়ারের দক্ষিণে পটার্স স্কয়ারে যেতে হবে । হাঁড়ি থেকে শুরু করে বাটি, দই কাপ,কারুকাজ খচিত স্যুভেনির-মাটি দিয়ে তৈরি প্রতিটি জিনিষ যেন নেপালি ঐতিহ্যকে ধারণ করে রেখেছে। রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চিত্রশিল্প, নেপালি ভাষায় পওকা, তিব্বতি ভাষায় থানকা।
থানকার অঙ্কনশিল্পীরা বয়ে বেড়াচ্ছেন নেপালি ধর্মীয় চিত্রশিল্পের প্রাচীনতম ধারা। দরবার স্কোয়ার অলিগলি জুড়ে রয়েছে নেপালি শিল্প পণ্যের অসংখ্য দোকান। নিজের পছন্দসই জিনিস কেনার পাশাপাশি এদেশে শিল্প এবং ঐতিহ্য নিয়েও ধারণা পাবেন অনেকখানি। ভক্তপুরে রয়েছে নেপালের জাতীয় আর্ট গ্যালারিও। জাতির প্রাচীন চিত্রকলা এবং ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলির একটি চিত্তাকর্ষক সংগ্রহ প্রদর্শন করছে।
ভক্তির শহর :ছবি : সংগৃহীত
বলা হয় 'ভক্তের জনপদ'-এ ভক্তপুর শহর। কেন বলা হয়- এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে খুব ভোরে এই শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়তে হবে। লাল পোশাক পরে মহিলারা এবং পুরুষেরা ঢাকাইয়া টুপি পরে হাজারও ভক্ত চারপাশে ছোট ছোট মন্দিরে নৈবেদ্য প্রদান করতে যায়। এমনই একটি স্থানীয় ধর্মীয় উপাসনালয় ভৈরবনাথ মন্দির। সাধারণ লাল ইটের নকশা এবং সোনার দরজা সহ একটি অলঙ্কৃত হিন্দু মন্দির। স্থানীয়রা কাছের বাজারের স্টলগুলি থেকে গাঁদা কিনে মন্দিরের প্রবেশদ্বারের চারপাশে মূর্তিগুলিতে রেখে দেয়। ভোরবেলায় এরকম দৃশ্য পুরো শহর জুড়ে দেখতে পাবেন।
ভক্তপুরে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে, তবে এখানে করার মতো অনেকের প্রিয় জিনিসটি ঘুরে বেড়ানো এবং অনন্য পরিবেশকে উপভোগ করা। যদিও কাঠমান্ডুতে জনাকীর্ণ এবং বিশৃঙ্খল বোধ হতে পারে, কিন্তু ভক্তপুরের চারপাশ অনেক নীরব এবং নির্মল। যেজন্য ভ্রমণে আপনি বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন। একটু সময় হাতে রেখে ঘুরতে আসুন এখানে। জায়গাটির ইতিবৃত্তি জানতে এবং স্থানীয় লোকদের সাথে পরিচিত হতে কয়েক দিন সময় নিন। দীর্ঘ ট্রেকিং ভ্রমণের পর কিছুটা মানসিক বিশ্রামের জন্য কিংবা হিমালয়ে যাওয়ার আগে স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ গ্রহণের এটি উপযুক্ত জায়গা।