দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিশাল আয়তনের জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই রিসোর্ট


নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট । ছবি : সংগৃহীত

 নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট এন্ড পিকনিক স্পট, এটি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। ঝিনাইদহ শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কালিগঞ্জ, কালিগঞ্জ থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট এন্ড পিকনিক স্পট। ইতিহাস থেকে জানা যায় এই নলডাঙ্গা গ্রাম মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে মোহাম্মদশাহী পরগনার রাজধানী হিসেবে সুপরিচিত ছিলো। নলডাঙ্গা রাজবাড়ির সর্বশেষ রাজা ছিলেন প্রমথ ভূষণ রায়বাহাদুর। এই রাজবাড়িটিতে বসবাসের জন্য বড় রাজভবন থেকে শুরু করে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাজবাড়ী থেকে বেগবতী নদী পর্যন্ত সুড়ঙ্গ  ছিল। এছাড়া ধর্মীয় উপসনার জন্য আটটি মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। যদিও বর্তমানে প্রায় সকল স্থাপনাই ধ্বংস হয়ে গেছে তবে সরকারি ভাবে সংস্কারের ফলে মন্দিরসমূহ বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে আছে।

রাজার বিশাল বাহিনী, রাজপ্রাসাদ কিংবা রাজত্ব বর্তমানে না থাকলেও কালের সাক্ষী হয়ে এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্দিরগুলো। রাজার স্নেহধন্য পাতা মিয়া যিনি পার্শ্ববর্তী তৈলকুপ গ্রামের বাসিন্দা তিনিই সর্বপ্রথম রাজার স্মৃতি রক্ষার্থে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন । পাতা মিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর গ্রামের বাড়িতে ২০ একর জায়গার ওপর নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট ও গবেষণা কেন্দ্র এবং একটি বিনোদন পার্ক নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। কাজ শেষ হলে তিনি এটির নাম রাখেন নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট ও প্রাচীন স্থাপত্য গবেষণা কেন্দ্র। রিসোর্ট সেন্টারটি  জাতীয় মান সম্পন্ন হওয়ার কারণে বর্তমানে এটি গবেষণা মূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট পরিপাটি রূপে নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট। ছবি : সংগৃহীত

 এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত পার্কটি ধীরে ধীরে একটি জাতীয় উদ্যানে পরিণত হয়েছে। ফলজ ও বনজ শ্রেণীর উদ্ভিদ, বাহারি ফুলের সমারোহ, সারি সারি গাছ এ পার্কটির সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।এছাড়া বাহারি ফুলের মোহিনী সুবাস,ঝরনার পাহাড়, ক্যাবল ট্রেন, ভূতের বাড়ি, লাভ কর্নার, মৎস্যকন্যা, ৬০ ফুট পাহাড়ের উপর রেস্টুরেন্ট, পাতাল ট্রেন (চলমান) নাগরদোলা, দোলনা, ঘোড়ার গাড়ি, ঘূর্ণি চেয়ার, স্পীড বোর্ড সহ আধুনিক বিনোদনের সকল সুব্যবস্থা রয়েছে এই রিসোর্টটিতে। এছাড়া রিসোর্টটির সৌন্দর্য বর্ধনে আরো কিছু কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, যা শেষ হলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম পিকনিক স্পট হিসেবে এটি খ্যাতি লাভ করবে।

নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট ছবি : সংগৃহীত

পিকনিক, ফ্যামিলি পার্টি, শিক্ষা সফর, আনন্দ ভ্রমণ সহ নানাবিদ কর্মকাণ্ডে উৎসবমুখর থাকে এই পার্কটি। এখানে গেলে দেখা মেলে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই একসাথে বিভিন্ন রাইডে চড়ছে, কেউ কেউ পাহাড়ের সৌন্দর্যে বিমোহিত হচ্ছে, কেউ কেউ ঝর্ণার জলে একটু শীতল হচ্ছে, কেউবা মনের অজান্তে হারিয়ে যাচ্ছে রিসোর্টের বিশাল ফুল শোভিত সবুজাভ বাহারি বৃক্ষরাজির মাঝে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে রিসোর্টটির প্রাঙ্গণ জুড়ে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। সর্বোপরি নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্টের এই মায়াময় বর্ণিল পরিবেশ যে কোন ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

খরচ : নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্টে বর্তমান প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। এছাড়া ৫০ জনের অধিক মানুষের একসাথে পিকনিক করতে চাইলে এক্ষেত্রে  প্রবেশমূল্য, স্পট ভাড়া, কার পার্কিং সহ মোট খরচ পড়বে প্রায় ৩০০০ টাকার মতো।

কীভাবে যাবেন : রাজধানী ঢাকার কল্যাণপুর, গাবতলী, মহাখালী হতে ঝিনাইদহ জেলায় সরাসরি বিভিন্ন ব্যানার এর এসি /নন এসি বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। পূর্বাশা, জেআর পরিবহন, হানিফ, শ্যামলী, স্কাইলাইন বাস গুলো সরাসরি ঢাকা টু ঝিনাইদহ চলাচল করে ভাড়া পড়বে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা। ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে যেতে হবে। এই ট্রেনটি ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ স্টেশন থামে। সেখান থেকে ঝিনাইদহ শহরে বাস বা সিএনজিতে যাওয়া যায়।  এক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগবে, ভাড়া পড়বে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ঝিনাইদহ শহর থেকে কালীগঞ্জ  উপজেলা ১৮ কিলোমিটারের পথ। কালীগঞ্জ উপজেলা বাসস্টেশন হতে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট। বাসস্টেশন হতে হাতের বাম দিকের রাস্তা ধরে এগুলো নলডাঙ্গা বাজার, বাজারের দক্ষিণ পাশেই অবস্হিত নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট।

কোথায় থাকবেন : থাকার জন্য ঝিনাইদহ শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হোটেল গুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল জামান, সৃজনী রেস্ট হাউস, ব্রাক রেস্ট হাউস, হোটেল রাতুল, হোটেল রেডিয়েশন সহ আরো বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউস। মানভেদে এগুলোর ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া অনুমিত সাপেক্ষে সার্কিট হাউসেও থাকা যাবে।

কোথায় খাবেন : হালকা খাওয়াদাওয়া কিংবা চা নাস্তা করার জন্য নলডাঙ্গায় কিছু হোটেল থাকলেও ভালো মানের খাবারের জন্য আপনাকে অবশ্যই ঝিনাইদহ ফিরে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ঝিনাইদহের পায়রা চত্বর এর আশেপাশে বেশকিছু ভালো মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রূপসী বাংলা রেস্তোরা,ইয়ং কিং চাইনিজ,ক্যাফে কাশফুল, অজয় কিচেন, সুইট হোটেল, আহার রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি। এছাড়া হাতে সময় থাকলে এ অঞ্চলের বিখ্যাত ঘোষ এর মিষ্টি,  পায়রা চত্বরের ছানা ও ছানার জিলাপির স্বাদও টেস্ট করে নিতে পারেন।  

ইমরানুল হক হৃদয়