দেশে দেশে রমযানের ঐতিহ্য 

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দেশে দেশে রমযানের ঐতিহ্য

রমযান মাস। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এক মাস। সারা বিশ্বে মুসলমানদের মাঝে এই মাসকে বরণ এবং উৎযাপন নিয়ে প্রচলিত আছে নানা উৎসব। পবিত্র কুরআন নাযিলের এই মাসকে ঘিরে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি মুসলমানদের আনন্দও থাকে অনেক বেশি। খ্রিস্টীয় ৬১০ সাল থেকে ইসলামের অন্যতম ফরয পালনের এই মাস উদযাপিত হচ্ছে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর উৎসবের এক দারুণ মিশ্রণের মধ্য দিয়ে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান নিজ নিজ জায়গা থেকে এই পবিত্র রমযান মাসকে পালন করেন নিজ নিজ ঐতিহ্যের সবটুকু উজার করে। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে বিশ্বের নানা প্রান্তের এমন ১০টি ঐতিহ্য তুলে ধরা হলো এবারের আয়োজনে।

ইন্দোনেশিয়ার পরিচ্ছন্নতা সংস্কৃতি

পুরো ইন্দনেশিয়াজুড়ে রমযানের আগের দিন নাগরিকদের মাঝে ঐতিহ্যগতভাবে চলে গোসল করার কর্মসূচি। খুব অদ্ভুত শোনালেও এটা সত্য যে, রমযানের চাঁদ দেখার মাত্রই প্রত্যেক ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক একবার করে সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গোসল করেন। বিশেষত মধ্য এবং পূর্ব জাভা অঞ্চলে এটি একেবারেই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পর্যায়ে পড়ে। এসময় প্রাকৃতিক ঝর্ণার নিচে ইন্দোনেশিয়ার পুরুষেরা নিজেদের মাথা থেকে পা অব্দি সম্পূর্ণ ভিজিয়ে নেন। জাভানিজ ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পাদুসান’। যার অর্থ দাঁড়ায়, 'গোসল করা'।




পাদুসান সংস্কৃতি, ইন্দোনেশিয়া। ছবি : দা জাকার্তা পোস্ট


পাদুসান ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক আবহের সাক্ষ্য বহন করছে যুগের পর যুগ ধরে। জাভানিজ সংস্কৃতিতে ঝর্ণা খুবই পবিত্র একটি সৃষ্টি। সেই সাথে এই পবিত্র মাস উদযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশও বলা চলে একে। ধারণা করা হয়, এই সংস্কৃতির আগমন ওয়ালি সাঙ্গোদের হাত ধরে। যারা কিনা ইন্দোনেশিয়ার বুকে প্রথম ইসলামের দাওয়াত দিতে এসেছিলেন। কয়েক বছর আগেও ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করার বিষয়টি খুব প্রচলিত হলেও বর্তমানে তা বাসা বাড়িতেই করছেন বেশিরভাগ নাগরিক।

ইফতারের ঘোষণা যখন কামানে

সাধারণত সারাদিন রোযার পর আমাদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সাইরেন কিংবা আযানের শব্দে। কিন্তু এদিক থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম লেবানন। সেখানে ইফতারের ঘোষণার জন্য রীতিমত কামান দাগানো হয়। যদিও এই অদ্ভুত সংস্কৃতির জন্ম অন্য আরেকটি দেশে কিন্তু লেবাননই এই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি লালন করেছে। মিদফা আল ইফতার নামের এই সংস্কৃতির জন্ম আজ থেকে ২০০ বছর আগে। মিশরের বুকে। সেসময় দেশটির শাসক ছিলেন অটোমান রাজা খোস কাদাম। নতুন একটি বোমার পরীক্ষা চালাতে গিয়ে ভুলবশত ইফতারের আগেই সেটি ছুঁড়ে ফেলেন। কিন্তু রাজধানী কায়রোর অধিবাসীরা মনে করতে থাকে এটি হয়তো ইফতারের সময় ঘোষণা করার নতুন এক উপায়। মিশরের অনেক অধিবাসীই তাদের শাসককে এজন্য ধন্যবাদ জানান এবং স্বয়ং রাজার কন্যা তার বাবাকে অনুরোধ করেন একটি সংস্কৃতি হিসেবে একে চালু রাখতে।




কামান দাগিয়ে ইফতারের সাইরেন, লেবানন। ছবি : ডেইলি নিউজ ইজিপ্ট


পরবর্তীতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই এই সংস্কৃতি চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৩ সালে লেবাননে বৈদেশিক আক্রমণ হলে এর চর্চা একেবারেই থেমে যায়। যুদ্ধের পর লেবাননে সেনাবাহিনী আবার সেই সংস্কৃতি চালু করেন এবং এটি এখনও লেবাননে চালু আছে।

ট্রিক অর ট্রিটের আদলে গড়া আরব আমিরাতের সন্ধ্যা

পাশ্চাত্যের দেশে হ্যালোউইনের সময় ট্রিক অর ট্রিটের মতই আরব আমিরাতে চলে 'হক উল লায়লা'। এই রীতিটি মূলত বাচ্চাদের জন্য। মূলত আরব সাগরের তীরবর্তী দেশগুলোতে শাবান মাসের ১৫ তারিখ শবে বরাতের বিকেলে বাচ্চারা তাদের ছোট ছোট ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নামতো এবং লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছড়া কাটতো। তবে, ট্রিক অর ট্রিটের বদলে তারা যে ছড়া কাটতো তার বাংলা দাঁড়ায়, 'আমাদের উপহার দাও, আল্লাহ তোমাকে পুরষ্কৃত করবেন। আর তোমাকে মক্কায় তার ঘরে নিয়ে যেতে সাহায্য করবেন'।




হক উল-লায়লা, আরব আমিরাত। ছবি : মিডল ইস্ট মনিটর


বেশ পুরাতন এই সংস্কৃতি এখন অনেক দেশেই বিলুপ্ত হলেও টিকে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এখনও ইফতারের আগে বিকেলবেলায় সেখানে ছোট শিশুরা জড়ো হয় প্রতিবেশীদের থেকে ইফতার আদায়ের জন্য। আর নিজস্ব সংস্কৃতির এই অংশটিকে বাঁচাতে প্রতিটি পরিবারও নিজেদের সবটুকু দিয়েই খুশি রাখতে চায় তাদের পরের প্রজন্মকে।

ঈদের চাঁদ এবং পাকিস্তানের মেহেদী সন্ধ্যা

প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের ঈদের আগের এই মেহেদির উৎসব এখন বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদের চাঁদ আকাশে দেখা গেলেই দলে দলে পাকিস্তানী নারীরা বেড়িয়ে আসেন রাস্তায়। নিজেদের ঈদের কেনাকাটা এবং সাজসজ্জার কাজটুকু তারা জমিয়ে রাখেন এই রাতের জন্যে। স্থানীয় সব বাজার এসময় সারা রাত খোলা থাকে। আর যারা মেহেদী নকশায় পটু তারা অস্থায়ী আসন গেড়ে বসেন মোড়ে মোড়ে। ভোররাত পর্যন্ত চলে এই উৎসব।




চাঁদ রাতে পাকিস্তানের মেহেদী সন্ধ্যা। ছবি : এএফপি


চাঁদ রাতের এই সংস্কৃতি পাকিস্তানের মেয়েরা লালন করছে যুগ যুগ ধরে। কালের পরিক্রমায় যা আমাদের দেশেও এসেছে। তবে বাংলাদেশের ঘরোয়া উৎসবের বিপরীতে পাকিস্তানের এই রাতটার বেশিরভাগ অংশ থাকে শহরের অলিগলি জুড়ে।

মরক্কোর নফরেরা

সপ্তম শতকে কোন একজন সাহাবী মরক্কোর পথে পথে সূরা পড়ে লোকদের জাগিয়েছিলেন সাহরীর করার উদ্দেশ্যে। সেই সংস্কৃতি এখন বজায় আছে মরক্কোতে। আর এই কাজে যারা নিয়োজিত, স্থানীয় ভাষায় তাদের বলা হয় হয় নফর। মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক জুব্বা, টুপি আর চপ্পল পায়ে তারা বাদ্য বাজিয়ে লোকদের ডেকে তোলেন সাহরী করার জন্যে। শহরের স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের বিশ্বস্ত লোকদের নিয়োগ করে থাকেন এই কাজের জন্য।





পবিত্র রমযান মাস। ছবি : কেভিন হুইপেল/কালচার ট্রিপ



আর সারামাসের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর লোকদের কাছ থেকে উপযুক্ত অভ্যর্থনাও জুটে নফরদের ভাগ্যে। আর পথে পথে যখন তারা লোকের ঘুম ভাঙাচ্ছেন, তখনও অনেক সময় নাগরিকদের ভালবাসায় সিক্ত হন একেকজন নফর।

দক্ষিণ আফ্রিকার চাঁদ দেখা মানুষেরা

ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখাটা সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য উৎসব সমতুল্য। কিন্তু চাঁদ দেখার এই রীতিকে একেবারেই অন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার 'মান কায়কার' বা চাঁদ দেখা মানুষেরা। ইংরেজিতে বলা চলে, Moon Watcher দক্ষিণ আফ্রিকার চাঁদ দেখার সংস্কৃতি একটু অদ্ভুত বলা চলে। রমাযানের শেষ সময় ঘনিয়ে আসলেই মুসলমানেরা জমায়েত হন কেপটাউন শহরে। সেখান থেকেই আসে চাঁদ দেখা বা ঈদের ঘোষণা। তবে, সবাই সেই চাঁদ দেখার বা ঘোষণা করার অনুমতি পায়না। কেপটাউনের সি পয়েন্ট, কিংবা সিগন্যাল হিলের উপর থেকে দেশটির মুসলিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মনোনীত ব্যক্তিরাই কেবল চাঁদ দেখার সুযোগ পায় এবং জনতাকে জানিয়ে দেয় পরেরদিন ঈদ-উল-ফিতর। আর চাঁ দেখার জন্য খালি চোখই ভরসা দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলিমদের জন্য।

দাভুলের শব্দে তুর্কি সাহরী

সেই অটোমান সম্রাজ্যে থেকে আজ পর্যন্ত তুরস্কের মুসলমানদের ঘুম ভাঙে দাভুলের শব্দে। দাভুল তুরস্কের নিজস্ব এক ধরনের ড্রাম যা দুইদিক থেকেই বাজানো যায়। প্রযুক্তি অনেকদূর এগিয়েছে, অ্যালার্ম ব্যবস্থা ঘড়ির পাশাপাশি ফোনেও এখন যুক্ত, অথচ এখন অব্দি তুর্কিদের ঘুম ভাঙে দাভুলের কল্যাণে। আজকের দিনেও তুরস্কের পথে পথে প্রায় হাজার দুয়েক বাদকের দল ঘুরে বেড়ায় দাভুল দিয়ে মানুষকে সাহরীর জন্য জাগাবে বলে।




তুরস্কের বাদক দল। ছবি : ডন


এসব বাদকের গায়ে জড়ানো থাকে অটোমান ঐতিহ্যের পোশাক। ফেজ আর কুর্তির সাথে থাকে ঐতিহ্যবাহী মোটিফ। প্রাচীন এই পোশাক গায়েই তারা তুরস্কের পথে নামে নিজস্ব দাভুল নিয়ে। আর এইসব বাদককে স্থানীয় জনগণ বখশিসের পাশাপাশি বরণ করে নেয় সাহরীর দাওয়াতে। পুরো মাসে কেবলমাত্র দুইবার এই বখশিস আদায় করে বাদকের দল। সম্প্রতি এই বাদকের দলকে সামাজিক সম্মান দিতে তুরস্কের সরকার মেম্বারশিপ কার্ড দিয়েছে, যেন প্রাচীন এই সংস্কৃতি লালনে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মও উৎসাহ বোধ করে।

আলোর শহর মিশর

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য কতটা আনন্দের হতে পারে তার পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব একমাত্র মিশরে। পবিত্র এই মাস এলেই পুরো মিশরের চিত্র রাতারাতি বদলে যায়। মিশর পরিণত হয় উৎসব এবং কোরআনের শহরে। প্রতিবছর রমযানের চাঁদ দেখা যাবার পরপরই রাস্তায় রঙিন লন্ঠন ঝুলিয়ে আর ফানুশ ওড়ানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের উৎসব সূচনা করা নীল নদের পাড়ের মানুষেরা। যদিও এই উৎসবটি যত্তা না ধর্মীয় তারচেয়ে অনেক বেশি সাংস্কৃতিক, তবুও মিশরে এটি পালন করা হয় সর্বচ্চ ধর্মীয় গুরুত্ব দিয়ে।




রমযান উপলক্ষে মিশরের স্তায় রঙিন লন্ঠন ঝুলিয়ে আর ফানুশ ওড়ানো হয়। ছবি : ডেইলি নিউজ ইজিপ্ট


ধারণা করা হয়, ফানুসের প্রচলন হয়েছিল ফাতেমীয় সম্রাজ্য চলাকালীন সময়ে। মিসরবাসী সেই সময় পহেলা রমযান খলিফা আল মুয়াজকে কায়রোতে বরণ করে নিয়েছিল রঙিন বাতি আর ফানুস দিয়ে। সামরিক কর্মকর্তারা মিসরের জনগণকে নির্দেশ দেন যেন প্রত্যেক অধিবাসী ঘরের জানালায় খলিফার সম্মানে বাতি জ্বালিয়ে রাখে। সেদিনের সেই নির্দেশ আজ প্রতি রমযানের প্রথম দিন পালন করে মিশরের জনগণ।

ইরাকের মিহাইব

মিহাইব ইরাকের একটি প্রচলিত খেলা। প্রধানত পুরুষেরাই এই খেলাটি খেলে থাকেন। প্রতিদিন ইফতার শেষে শত শত ইরাকি জনতা এই খেলার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন। একেকটি দলে ৪০ থেকে ২৫০ জন পুরুষ অংশ নিয়ে থাকেন। প্রতিটি দলের নেতা একটি মিহাইব বা চাকতি তার চাদরের নিচে ঘুরতে থাকে। এসময় নিজদের দলের কোন একজনের কাছে গোপনে সেই চাকতি দিয়ে আসেন। বিপক্ষ দলকে কেবল অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে সেই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে হয়। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি রমযান মাস এলেই ইরাকের রাস্তায় ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে যায়। তবে বিগত এক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ইরাকি জনগণের এই আনন্দ খুব একটা চোখে পড়েনি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সুস্থতার পাশাপাশি ইরাকে সামাজিক স্বস্তি ফিরেছে। ফিরেছে রমযানের এই ঐতিহ্যটিও।





রমযানে ইরাকের মিহাইব ইরাকের প্রচলিত খেলা। ছবি : আল-জাজিরা


দিল্লির সেহরীওয়ালা

দিল্লীর এই সেহরীওয়ালা বা জোরিদারদের সাহরীর সময় ডেকে তোলার ঐতিহ্য এখন প্রায় সংকটের মুখে। মুঘল সম্রাট বাবরের সময় থেকে চলমান এই প্রক্রিয়াটি এখন যারা বজায় রেখেছেন তারা সবাই বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। ঘুম থেকে সাহরীর জন্য ডাকতে তুর্কিদের মত বাদ্য যন্ত্রের সাহায্য না নিয়ে তারা নিজেদের কন্ঠকে ব্যবহার করেন। আল্লাহর নামে যিকির, রাসূলের প্রতি দরূদ কিংবা গজল গেলে দিল্লির পথে পথে এখনো বেশ কিছু মানুষ মুসলমানদের সাহরীর জন্য ডেকে যায়। পুরাতন দিল্লীতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে রমাযান মাসে রাত আড়াইটা নাগাদ এইসব সেহেরীওয়ালা বেরিয়ে পড়েন লাঠি হাতে। কখনও সদর দরজা, কখনো বা বাড়ির দেয়ালে লাঠি ঠুকে তারা জানান দেন, সাহরীর সময় সমাগত।  


জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম