টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : 'পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার বিকল্প নেই'

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পর্যটন শিল্পের এই ক্রান্তিকালে উত্তরণের উপায় জানাচ্ছেন টোয়াব সভাপতি




মো. রাফিউজ্জামান রাফি দেশের পর্যটন খাতের শীর্ষ সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) কার্যনির্বাহী পরিষদের ২০১৯-২১ মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একাধারে একজন পর্যটন  উদ্যোক্তা এবং সংগঠক। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালনা কমিটির অন্যতম একজন সদস্য। একই সাথে এফবিসিসিআই-এর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় (পর্যটন) সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

পর্যটন শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠিত স্ট্রেইটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান নির্বাহী তিনি। দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন। পর্যটন উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে তার অবস্থান অনন্য সাধারণ। এই শিল্পকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করতে  এবং পর্যটনশিল্পের স্বার্থ রক্ষার্থে নিরসল কাজ করে চলা এই সংগঠকের মুখোমুখি হয়েছে ট্রাভেল বাংলাদেশ। আজকের সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলছেন মহামারী কোভিড-১৯ এর দু:সময়ে দেশের পর্যটনশিল্প খাতের সংকট ও সংকট সমাধানে করণীয় এবং আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে।



ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব)-এর সভাপতি মো. রাফিউজ্জামান রাফি

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব)-এর সভাপতি মো. রাফিউজ্জামান রাফি। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ এর দু:সময়ে দেশের পর্যটন শিল্পের অবস্থা কী?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : এই সময়টা সারা বিশ্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ডিসেম্বরে চীনের উহানে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও দেশে তা দেখা দেয় মার্চ মাসে। এরপর থেকে লকডাউনের কারণে অন্যান্য দিকের মতো পর্যটন শিল্পেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। মূলত পর্যটন শিল্প সর্বপ্রথম আঘাত প্রাপ্ত হয় যেকোনো প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট  দুর্যোগের সময়।

কোভিড-১৯ এর সময়ে এই শিল্প দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, ইতোপূর্বে বিশ্বের ইতিহাসে যেমনটি আর হয়নি। এই অবস্থায় আমরা টোয়াবের সকল সদস্যের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গবেষণামূলক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছি। যেখানে দেখা যায়,  লকডাউনের কারণে  পর্যটন শিল্পে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে! এই প্রতিবেদনটি আমরা পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি এবং একই সাথে গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছেও পাঠিয়েছি।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : সরকারের কাছ থেকে কোন ধরনের সহযোগিতা চেয়েছেন?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : আমাদের গবেষণালব্ধ এই প্রতিবেদনটি মার্চের ২১ তারিখ একটি সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছি প্রথমে। গত ৬ এপ্রিল কিছু সুপারিশ এবং সহযোগিতার দাবিসহ পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করি। এখানে মূলত আপদকালীন সময়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা চেয়ে সরকারের কিছু দাবি তুলে ধরেছি আমরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পর্যটন শিল্পকে রক্ষা ও এর ব্যবসায় অফিস-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা প্রদান করা, পর্যটন সংশ্লিষ্ট, প্রান্তিক কর্মী যারা বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেন, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, ফেরিওয়ালা, ট্যুরগাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সহ সর্ব শ্রেণির জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, তাদেরকে রেশনের আওতায় নিয়ে আসা ইত্যাদির জন্য সরকারের কাছে বরাদ্দের দাবি  জানিয়েছি। সেই সাথে কোভিড- ১৯ এর পরবর্তী সময়ে পর্যটনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য আমরা সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ঋণেরও দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আমরা কোনো কিছুই এখনো পাইনি।


বাংলাদেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য সুন্দরবন

বাংলাদেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য সুন্দরবন। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : সরকারের সাহায্য ছাড়া এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আপনাদের সাংগঠনিক পদক্ষেপ কী?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : পৃথিবী সৃষ্টির পর এমন মহাদুর্যোগ পর্যটন শিল্পে আর আসেনি। এর আগে দুটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু কোভিড-১৯ এর ফলে এভাবে সারাবিশ্বে লকডাউন আর কখনো হয়নি। বিশ্বের মানুষ এমন অনিশ্চিত জীবনে আগে কখনো পড়েনি। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সরকারি সাহায্য ছাড়া আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় একটা শিল্প বেঁচে থাকতে পারে না। ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় হয়তো কিছু কর্মচারী টিকিয়ে রাখা যায়, একটা প্রতিষ্ঠানের অফিস টিকিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু যে শিল্পে পরোক্ষা-প্রত্যক্ষভাবে ৪০ লক্ষ লোক কর্মরত, যে শিল্প এতো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, যে শিল্পের জিডিপিতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ অবদান রাখে, শতভাগ রেভিনিউ আয় করে এবং যে শিল্প গ্রামীণ পর্যায়ে অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখে; এমন শিল্পের সরকারি সাহায্য ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো উপায় থাকে না, বিকল্পও থাকে না।

আরও জানতে : আর্থিক ক্ষতি ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার, চাকরিচ্যুত সাড়ে সাত কোটি

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আমাদের প্রত্যাশা শিগগিরই লকডাউন উঠে যাবে।  ইতোমধ্যে ইউরোপ পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য শেনজেন ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : কোনো দেশই এখন পুরোপুরি ও স্বাধীনভাবে রিওপেন করতে পারেনি। তবে সীমিত আকারে বিভিন্ন শর্তজুড়ে দিয়ে দেশগুলো পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। ইউরোপের শেনজেনভুক্ত ২৯টি দেশ বিশ্বের ৫৩টি দেশের একসেস দিয়েছে। তার মধ্যে আর কোনো দেশের একসেস নেই। বাংলাদেশও একসেস না পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো বাদবাকি দেশগুলোর জন্যও খুলে দেয়া হবে।

আরও পড়ুন : কোন কোন দেশের সীমান্ত পর্যটকদের জন্যে পুনরায় খুলতে শুরু করেছে?


মিশর খুলে দেয়া হচ্ছে। তবে সেখানে কোভিড-১৯ সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে হবে। তারাও টেস্ট করাবে। যদি টেস্টে কোভিড-১৯ পজিটিভ আসে তাহলে ১৪ দিনের জন্য বাধ্যতামূলক আইসোলেশন নিয়ে যাবে। সৌদি আরবে আমাদের জন্য হজ বন্ধ। অন্য দেশের জন্যও একই নিয়ম। যারা সেখানে অবস্থান করছেন তাদের মধ্যে ১০ হাজারের মতো হজ করতে পারবেন। এদিকে ভারতের সীমান্তও বন্ধ। সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া খুলবে আগস্ট মাসের দিকে। মূলত কোনো দেশেই  ট্যুরিজম রিওপেন করেনি।


স্ট্রেইটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান নির্বাহী মো. রাফিউজ্জামান রাফি

স্ট্রেইটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান নির্বাহী মো. রাফিউজ্জামান রাফি। ছবি : সংগৃহীত


 কিছু জরুরি প্রয়োজনে বা যারা দেশগুলোতে কর্মরত ও পরিবার-পরিজন আছে এমন লোকজন যাতায়াত করতে পারছেন। সম্ভবত ধীরে ধীরে রিওপেন হবে এভাবে। বাংলাদেশেও জুলাই মাসে কক্সবাজার ও কুয়াকটা রিওপেন করা হবে। মূলত সীমিত আকারে। অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। কিন্তু পর্যটন কখনো নিয়ম নীতির মধ্যে চলে না। এটা হলো বিনোদরে মাধ্যম। মানুষকে রিফ্রেশ করে, স্বস্তি দেয়। এখানে এতো ধরা-বাধা ও নিয়ম নীতি থাকলে মানুষ স্বস্তি নিয়ে চলাচল করতে পারে না, প্রয়োজন হয় অনুকুল পরিবেশ। সে জন্য অভ্যন্তরীন পর্যটন চালু হলেও সাড়া পড়বে না।

দেশের সাম্প্রতিক আপডেট দেখতে : চালু হচ্ছে বিমান চলাচল, খুলছে পর্যটন কেন্দ্র

ট্রাভেল বাংলাদেশ : কবে নাগাদ পর্যটনব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে পারে?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : যতোদিন পর্যন্ত কোভিড-১৯ মানুষের নিয়ন্ত্রণে না আসবে, মৃত্যুর হার না কমবে, যতোদিন এই ভাইরাসকে মানুষ জয় করতে না পারবে ততোদিন মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন ও চলাফেরা করতে পারবে না এবং পর্যটনব্যবস্থাও ততোদিন স্বাভাবিক হবে না।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে পর্যটনব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে বলে মনে করেন?

মো. রাফিউজ্জামান রাফি : কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবীর সবদিকে একধরনের নতুনত্ব আসবে। পরিবর্তিত রূপ লক্ষ্য করা যাবে। কোভিড-১৯ মৃক্ত পৃথিবীতে পর্যটন দারুণ ভূমিকা রাখবে। আমরা যদি দেখি এই বছর প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য স্বমহিমায় ফুটে উঠেছে। এভাবে বিশ্বের প্রকৃতি স্বরূপ ফিরছে। তেমনই পর্যটনব্যবস্থাও নতুনভাবে উন্মোচিত হবে। এর জন্য আমাদেরকেও প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। তা হতে পারে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে, আর্থিক সহযোগিতা করে। যদি কোনো প্রকার সহযোগিতা না থাকে অনেক দক্ষ জনশক্তি হারিয়ে যাবে, পর্যটন শিল্পের অফিসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এতে শিল্পের ক্ষতি হবে। দক্ষ লোক যদি পেশায় না থাকে তাহলে আমাদের দেশ অন্য দেশ থেকে পিছিয়ে পড়বে। তাই সবকিছুকে ঠিকভাবে এগিয়ে নিতে এবং  পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে সাহায্য সহযোগিতা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

ইন্টারভিউয়ের তারিখঃ ৩০শে জুন, ২০২০

ইন্টারভিউ নিয়েছেনঃ সাইফুল্লাহ সাদেক   এস এম