জোড় বাংলা মন্দির : কালের গর্ভে বিলীন হওয়া এক উপাসনালয়

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : একটি মন্দিরের চূড়া থাকলেও অন্য মন্দিরের চূড়া অবশিষ্ট নেই

Jor-Bangla-Mandir টেরাকোটার সুদৃশ্য ফলক সমৃদ্ধ মন্দিরের প্রবেশপথ। ছবি : গাইড ভাই

জীর্ণপ্রায় এক ইটের স্তুপ, শেওলা আর আগাছা বেষ্টিত দেয়াল, টোকা দিলেই যেন হুড়মুড়িয়ে যাবে শতবর্ষ পুরনো দালানের অস্তিত্ত্ব। বের হয়ে থাকা লাল ইটের দেয়াল আর পোড়ামাটির টেরাকোটা যেন জানান দিচ্ছে এক মহাকালের ইতিহাস। একসময় কাসার ঝংকারে, ঢাক-ঢোল, বাদ্য আর বাজনায় মুখরিত থাকত যে অঞ্চল সেখানে আজ শ্মশানের নীরবতা। নেই সন্ধ্যা আরতি দেয়ার পুরোহিত, নেই পুজারীর মুখর পদচারণা আর ঘন্টার টুংটাং শব্দ। যেখানে সন্ধ্যা হলেই শঙ্খের সুর ভেসে যেত দূর থেকে দূরান্তে, সেখানে আজ মন খারাপ করে দেয়া নীরবতা। কালের স্মৃতি বুকে ধারণ করে শুধু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে দোচালা এক উপাসনালয়। সূচনা দেখেই বুঝে যাওয়ার কথা যে এক প্রাচীন মন্দিরের কথা বলছিলাম। পদ্মাপাড়ের জেলা রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া গ্রামে অবস্থান এই মন্দিরের।

মন্দির এখানে একটা নয়, বরং দুটি। স্থানীয়দের মতে বর্তমান মন্দিরের অবস্থান যে স্থানে সেখানে আগে ছিলো পদ্মার চর এবং সে স্থানটি ছিলো নলখাগড়ার বনে পরিপূর্ণ, যে কারণে মানুষের মুখে মুখে এই স্থানের নাম হয়ে যায় নলিয়া। এখানেই আনুমানিক ১৬৫৫ খৃষ্টাব্দে রাজা সীতারাম রায় এই মন্দির স্থাপন করেন এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই আমলে এই গ্রামে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের সন্ধান না মেলায় রাজার অনুরোধে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে শ্রী কৃষ্ণ রাম চক্রবর্তী এই নলিয়া গ্রামে এসে দেব মন্দির এবং বিগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

jor bangla আগাছা জমে থাকা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দেয়াল। ছবি : দৈনিক চিত্র

মন্দিরটি নির্মাণে উড়িষ্যার গৌরীয় স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থানে এই ধরণের স্থাপত্যরীতির মন্দির দেখা যায়। এই নির্মাণরীতির মধ্যে আবার দুটি ধারা রয়েছে। একটি 'চালা' ধারার এবং অপরটি 'বাংলা' ধারার। নলিয়ার এই মন্দিরটি 'বাংলা' ধারায় নির্মিত। দুটো চূড়া বিশিষ্ট বলে 'জোড় বাংলা' নাম হয়েছে এই মন্দিরের। বর্তমানে একটি মন্দিরের চূড়াই অবশিষ্ট রয়েছে, আরেকটি হার মেনেছে সময়ের কাছে। মন্দিরের দেয়ালে এখনও দেখা যায় মধ্যযুগীয় টেরাকোটা শিল্পের অপূর্ব কিছু নিদর্শন। পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন শ্লোক, স্তুতি আর হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী। মন্দিরের বিগ্রহ অনেক আগেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্যোগে কাছেই আরেকটি মন্দির স্থাপন করে সেখানে প্রতিবছর বাসন্তী পূজার আয়োজন করা হয়।

Jor_Bangla_Mandir জোড় বাংলা মন্দির, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি। ছবি : ভ্রমণ বন্ধু

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শতবর্ষ পুরাতন এই মন্দির এখন ভগ্নপ্রায়। পুরানো জৌলুস হারিয়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া এই মন্দির দেখতে তারপরও ভিড় করেন অনেক পর্যটক। আপনিও তাদের সাথে সামিল হয়ে দেখে আসতে পারেন এই পুরানো মন্দির। লাল ইটের দেয়াল, টেরাকোটা আর পোড়ামাটিতে লিপিবদ্ধ কাহিনী কিছুটা হলেও অতীত হাতড়ানোর সুযোগ করে দিবে আপনাকে। এছাড়া রাজবাড়ি গেলে আরও দেখে আসতে পারেন শাহ পাহলোয়ানের মাজার, সমাধিনগর মঠ/অনাদী আশ্রম, নীলকুঠী ইত্যাদি ঐতিহাসিক স্থাপনা। আর খাবারের মধ্যে পান বাজারের ভাদু সাহার দোকানের চমচম, রেলগেটের হৈরা শাহের চপ এবং ঝালাই পট্টির কুলফি মালাই খেয়ে আসতে ভুলবেন না।

কীভাবে যাবেন : জোড় বাংলা মন্দির দেখতে আপনাকে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে প্রথমে আসতে হবে রাজবাড়ী জেলা সদরে। ঢাকা থেকে রাজবাড়ীর সড়ক পথে দূরত্ব ১৩৫ কিলোমিটার, সময় লাগবে আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা। ঢাকার গাবতলি বাস স্ট্যান্ড  থেকে রাবেয়া, রাজবাড়ি পরিবহন, সপ্তবর্ণা, সাউদিয়া ইত্যাদি পরিবহনের বাস ঢাকা টু রাজবাড়ি রুটে নিয়মিত চলাচল করে। ভাড়া জনপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা। এছাড়াও বিআরটি সিতে উঠে ১০০ টাকায় পাটুরিয়া ঘাট এসে লঞ্চ অথবা ফেরি দিয়ে নদী পার হয়ে আবার ওপার থেকে বাসে করে রাজবাড়ি পৌঁছাতে পারবেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে খরচ একটু কম হবে। রাজবাড়ি থেকে বালিয়াকান্দি যাওয়ার সরাসরি গাড়ি রয়েছে। বালিয়াকান্দি থেকে জোড়বাংলা মন্দিরের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। বালিয়াকান্দি বাসস্ট্যাণ্ডে নেমে ইজিবাইক, অটোরিকশা কিংবা নসিমনে করে জোড়বাংলা মন্দিরে যেতে পারবেন।   


তথ্যসূত্র : mailto:http://www.rajbari.gov.bd/site/tourist_spot/d94dacc1-2014-11e7-8f57-286ed488c766/%E0%A6%9C%E0%A7%8B%E0%A7%9C%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0 mailto:https://www.vromonbondhu.com/listing/%E0%A6%A8%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%9C%E0%A7%8B%E0%A7%9C-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0/ mailto:https://guidebhai.com/place/%E0%A6%9C%E0%A7%8B%E0%A7%9C-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF/