নিজস্ব স্বকীয়তা আর ঐতিহ্যের মিশেলে রাজবাড়ী জেলা ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেশ সমৃদ্ধ অবস্থান তৈরি করেছে।
১৯৮৪ সালের গোয়ালন্দ মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরিত বর্তমানের রাজবাড়ী পদ্মা, হড়াই, গড়াই, চন্দনা, কুমার আর চিত্রা পলিবাহিত এক কালের 'বাংলার প্রবেশদ্বার' বলে পরিচিত ছিলো। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামেও এখানকার মানুষরা ছিলো সমানভাবে সক্রিয়।
ফকীর সন্ন্যাস আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বদেশী আন্দোলন, মুজাহিদ আন্দোলন, ওহাবী আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহসহ ব্রিটিশ বিরোধী বহু আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণ আন্দোলন, রেল শ্রমিক আন্দোলন এবং সর্বোপরি মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজবাড়ীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ঐতিহাসিক এই জেলাটিতে রয়েছে নানান প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থান। তেমনই একটি বাবা মুর্শিদ জামাই পাগলের মাজার (Baba Murshid Jamai Pagoler Majar)।
রাজবাড়ী জেলা শহরের দক্ষিণ-পূর্বে আলীপুরে ইউপির ০৩ নং ওয়ার্ডে ইন্দ্রনারায়নপুর গ্রামে বাবা মুর্শিদ জামাই পাগলের মাজার অবস্থিত। জেলা শহর থেকে এটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
জামাই পাগলের মাজার ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয় সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে, জামাই পাগলকে নিয়ে এখানে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।
জামাই পাগলের মাজার-এর ইতিহাস
১৯৬০ সালের দিকে এই এলাকায় নেংটি পরা অবস্থায় জামাই পাগলকে দেখা যায়। বর্তমান মাজার স্থান হতে পশ্চিম দিকের রাস্তা দিয়ে সামনে গেলেই রাধাগঞ্জ বিল। এই বিলের নিকটে মোহন শাহ-এর বটতলায় মুর্শিদ জামাই পাগলকে ধ্যান মগ্ন থাকতে দেখা যায়। মুর্শিদ জামাই কামেল ফকির হিসেবেই এখানকার মানুষের সাথে পরিচিত ছিলেন।
শোনা যায়, জামাই পাগলের আদি নিবাস পাবনায়। তার আসল নাম পরিচয় যদিও জানা যায় না। পাবনা জেলার স্থানীয় এক ধনী ব্যক্তি তার বোবা মেয়েকে বাক প্রতিবন্ধকতার জন্য বিয়ে দিতে পারছিলেন না। অবশেষে তিনি জামাই পাগলের সাথে তার বোবা মেয়ের বিয়ে দেন। তবে বিয়ের রাতের পর থেকেই জামাই পাগলকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। তবে, তার বোবা স্ত্রী সকাল হতেই আবিষ্কার করে যে তিনি তার কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলাদীপুরে জামাই পাগলকে পাওয়া গেলেও তিনি আর সংসারে ফিরে যান নি। সেই থেকেই তার নাম জামাই পাগল হিসেবে পরিচিতি পায়।
জামাই পাগল যখন এই অঞ্চলে আসেন তখন এখানে অনেক মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিলো। জামাই পাগল এখানে কলেরা রোগীদের সারিয়ে তোলেন বলে শোনা যায়। সেই থেকেই এখানকার মানুষদের নিকট জামাই পাগল আধ্যাত্মিক ফকিরের মতো তুলনীয় হয়।
জামাই পাগলের মৃত্যুর পর জোব্বা পরিহিত অজ্ঞাত এক লোক এসে তাঁর সৎকারের ব্যবস্থা করেন। তাঁর কবরস্থান ঘিরেই মাজার গড়ে ওঠে। চটের বস্তা পরিহিত এবং সারা শরীরে মোটা শেকল পেঁচানো নূর বাকের শাহ নামে এক ভক্ত এসে প্রথমে মাজারে অবস্থান এবং দেখাশোনা করেন।
নূর বাকের শাহ-এর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য গৌরী পাগলী মাজারের দেখাশুনা করেন। নূর বাকের শাহ ও গৌরী পাগলী দুই জনকেও জামাই পাগলের কবরের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়।
প্রতি বছর এখানে ৫টি ঔরশ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৫ ও ৩১ ই ফাল্গুনের ঔরশ বেশ বড়সড় হয়।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকার গাবতলি থেকে বেশ কয়েকটি বাস রাজবাড়ী যাতায়াত করে। রাজবাড়ী পরিবহন, রাবেয়া, সাউদিয়া, সপ্তবর্ণ পরিবহনের বাস রয়েছে এখানে। এছাড়াও বিআরটিসি বাসে পাটুরিয়া এসে লঞ্চে নদী পেরিয়ে পুনরায় বাসে চড়ে রাজবাড়ী যেতে পারেন। এভাবে যাওয়াটা অনেকটা সাশ্রয়ী। রাজবাড়ী পৌঁছে আলাদিপুর বাজার হতে স্থানীয় বাহনে মাজারে যেতে পারেন।