বিরল সব প্রাণী ও প্রকৃতির বিস্ময়কর রূপে সাজানো কমোডো ন্যাশনাল পার্ক
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ড্রাগন সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল কমোডো ন্যাশনাল পার্ক
ছবি : সংগৃহীত
কমোডো ন্যাশনাল পার্ক ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রস্থলে সুমবাওয়া এবং ফ্লোরসের দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত। এই পার্কটি তিনটি বৃহত্তম দ্বীপসহ (কমোডো, পাদর এবং রিঙ্কাহ) আরও প্রায় ২৬টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। ১৯৯১ সালে এই উদ্যানটি ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট এবং ম্যান অ্যান্ড বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসাবে ঘোষিত হয়। একটি দেশ ভ্রমনের অন্যতম কারণ হচ্ছে সেই দেশ সম্পর্কে জানা এবং দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি উপলব্ধি করতে পারা। আর দেশটির ন্যাশনাল পার্ক যেন অনেকাংশেই এসব বিষয়বস্তুগুলোকে নিজের ভেরত ধারণ করে থাকে। পর্যটকেরা ইন্দোনেশিয়া দেশটিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে নিজেদের ভ্রমণ তালিকায় রাখে এই ন্যাশনাল পার্কটি। প্রতিবছর হাজার হাজার দর্শনার্থীর দেখা মেলে এই পার্কটিতে। পার্কটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা মুলত কমোডো ড্রাগন সংরক্ষণের জন্য তৈরী করা হয়েছিল।পরবর্তীতে পার্কটি সমগ্র জীববৈচিত্র্য, স্থল এবং সামুদ্রিক প্রাণী উভয়ই রক্ষায় প্রসারিত করা হয়েছে।পার্কটি দেশটির পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কতৃক পরিচালিত হয়। ইন্দোনেশিয়ার এই ন্যাশনাল পার্কটির আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭৩৩ কিলোমিটার।
ছবি : গো ফার গো ক্লোজ
সুন্দর গোছানো এই পার্কটিতে বন্য প্রানীসহ অনেক প্রাণী এবং উদ্ভিদ সংরক্ষিত রয়েছে। কমোডো ন্যাশনাল পার্কে সর্বাধিক আকর্ষনীয় বাসিন্দা হলো কমোডো টিকটিকি : ভারানাস কমোডোনেসিস। এই বিশালাকার টিকটিকি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। কমোডো টিকটিকি তার চেহারা এবং আক্রমনাত্মক আচরণের কারণে সবচেয়ে বেশি পরিচিত 'কমোডো ড্রাগন' নামে। কমোডো ড্রাগন সবচেয়ে বড় জীবিত প্রজাতি। এটি প্রায় গড়ে ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। প্রজাতিটি ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াজুড়ে যে বৃহত টিকটিকিগুলো ছিল সেই প্রজাতিগুলোর সর্বশেষ প্রতিনিধি। এর ওজন হয় প্রায় ৭০ কেজি।
কমোডো ড্রাগন। ছবি : দ্যা গার্ডিয়ান
কমোডো ড্রাগন থাকার পাশাপাশি পার্কটিতে রয়েছে আরও অনেক উল্লেখযোগ্য স্থলজ প্রজাতি, যেমন : স্ক্রাব পাখি (যার পা সুন্দর কমলা রঙের হয়), ইন্দোনেশিয়ান ইঁদুর এবং বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ। এছাড়া অনেক বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীরও দেখা মেলে এই পার্কটিতে। সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে তিমি, হাঙ্গর, সানফিশ, ডলফিন, পিগমি ঘোড়া, ফলস পাইপফিশ, ক্লাউন ফ্রগফিশ , নুদিব্র্যাঙ্কস, নীল রঙের অক্টোপাস, স্পন্জ, টুনিকেটস এবং ২৬০ প্রজাতির প্রবাল। এছাড়াও বন্য শুকর, জল মহিষ, কাঁকড়া এবং সিভেটসহ অনেকগুলো স্তন্যপায়ী প্রাণীরও দেখা মেলে এই ন্যাশনাল পার্কটিতে। পার্কটিতে প্রায় বারো প্রজাতি সাপের সন্ধ্যান মেলে। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য যবন থুথু কেউটে (Naja sputatrix), রাসেল ভাইপার (Daboia russelii), পিট ভাইপার (Trimeresurus albolabris ), নীল ঠোঁটযুক্ত সাপ ( Laticauda laticaudata ), এবং টিমর পাইথন। পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতি এবং দুর্লভ প্রজাতির ব্যাঙ।
কমোডো দ্বীপে দেখা মেলে এই বিরল হোয়াইট-লিপড পিট ভাইপারের। ছবি : পিন্টারেস্ট
পার্কটিতে পাওয়া যায় প্রায় ২৮ প্রজাতি পাখি। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বনমোরগ, তোতাপাখি, ঝুটিওয়ালা কাকাতুয়া, ঘুঘু, কবুতর, ঈগলসহ আরও কত রঙ-বেরঙের পাখি। পার্কের ভেতরে প্রায় ৪ হাজার মানুষের বসবাস। গ্রামগুলোতে রয়েছে বাসিন্দাদের শিক্ষার জন্য স্কুল। প্রতিটি গ্রামে গড়ে চারটি শ্রেণী এবং চারজন শিক্ষক থাকে। জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। যোগাযোগের জন্য তারা বাজো ভাষা ব্যবহার করে থাকে। সুনসান পরিবেশে এক অন্যরকম অনুভূতিতে ঘেরা এই ন্যাশনাল পার্কটি। নির্মল পরিবেশে একান্তে নিজস্ব সময় কাটাতে এই পার্কটির বিকল্প কিছু হতে পারে না। সাথে যোগ হবে রোমাঞ্চকর কিছু অভিজ্ঞতা। নৌকায় ভ্রমন কিংবা গোলাপী সমুদ্র তীরে বসে নিজের মতো করে উপভোগ করা যায় পুরো সময়টা।
থাকা-খাওয়া : যেহেতু জায়গাটি পর্যটনকেন্দ্র তাই সহজেই থাকা-খাওয়ার সুবিধা পাওয়া যায়। আশেপাশেই রয়েছে রেস্তোরাঁ এবং হোটেল। আর ট্যুর গাইডের সঙ্গে গেলে তারাই সব ধরনের ব্যবস্থা করে দেয়। খাবারের জন্য বিভিন্ন সি ফুডসহ স্থানীয় খাবার তো রয়েছেই।
যেভাবে যাবেন : কমোডো ন্যাশনাল পার্কের দেখা পেতে প্রথমেই যেতে হবে ইন্দোনেশিয়া। পরে পশ্চিম ফল্লোরেস লাবুয়ান বা পূর্ব সুমবাবার হয়ে পৌঁছানো যায় পার্কটিতে। বালির ডেনপাসার থেকে প্রতিদিন বিমান সিডিউল করা রয়েছে যাতে খুব সহজেই চলে যাওয়া সম্ভব এই ন্যাশনাল পার্কটিতে।
ভ্রমণ সতর্কতা :
- পরিবেশ বা প্রানীর ক্ষতি হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।
- নিজের ভদ্রতা বজায় রাখুন।
- পরিবেশ দূষণ থেকে বিরত থাকুন।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, নলেজ হাব