নীলগিরি পর্বতের কোলে গড়ে ওঠা উটি শহরের নজরকাড়া সৌন্দর্য। ছবি : পিনিএমজি ডট কম
দক্ষিণ ভারতের দুর্নিবার এক আকর্ষণ হল তামিলনাড়ু। অপরূপ পবিত্র মন্দির থেকে শুরু করে সমুদ্র সৈকত, নজরকাড়া দুর্গ, বিশাল জলপ্রপাতসহ তামিলনাড়ু পরিপূর্ণ নানা আকর্ষণে।
পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা তামিলনাড়ু তাই পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দারুণ প্রিয়। আর এই তামিলনাড়ুর এক অপূর্ব রত্ন হল উটি (Ooty)।
মেঘের দেশে মন ভালো করে দেয়ার মতো কোনও জায়গায় যদি হারাতে চান তবে উটি আপনার জন্য চমৎকার এক জায়গা। দক্ষিণ ভারতের পাহাড়ঘেরা এই শৈল শহর নীলগিরি পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্ন-সুন্দর এক দেশ। এই পাহাড়ি রানীর শহরে এসে আপনি মুগ্ধতার জগতে হারাবেন নিশ্চিত।
অবস্থান
উটি হলো তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলার এক শৈল শহর। নীলগিরি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এই শহরটি শৈল শহরের রানী হিসেবে পরিচিত।
সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এই শহরটি ২,২৪০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। উটির পুরো নাম 'উটাকামণ্ড'। সংক্ষিপ্ত করে একে উটি নামে ডাকা হয়। তামিলনাড়ুর অত্যন্ত জনপ্রিয় এই শহরটি ব্রিটিশদের শাসনে ছিল।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদীরা মাদ্রাস প্রেসিডেন্সি ঘোষণা করার পর উটিকে তারা গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেন।
উটি ইংরেজ শাসকদের খুবই পছন্দের জায়গা ছিল। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় এই শহরটি রয়েছে।
নীলগিরি পর্বতের কোলে গড়ে উঠা এই শহরটি নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের রানী। সবুজে ঢাকা ঢেউ খেলানো পাহাড় ও চোখ জুড়োনো প্রাকৃতিক পরিবেশে এখানে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য মন ভোলায়।
উটির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চাইলেই মেঘ ধরতে পারবেন। দূর থেকে পাহাড়ের আস্তরণে ইটের ঘরবাড়ী, হোটেল রেস্ট হাউস দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে ঘর, নীচে ঘর, উপরেও ঘর। এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য এই শহরের পরতে পরতে। অপূর্ব এই শহরটিতে এসে কি কি দেখবেন তা নিচে দেয়া হল :
গভর্নমেন্ট রোজ পার্ক :
প্রায় সাড়ে তিনহাজার প্রজাতির গোলাপের দেখা পাবেন গভর্নমেন্ট রোজ পার্কে। ছবি : মেইক মাই ট্রিপ ডট কম
উটিতে আছে গভর্নমেন্ট রোজ পার্ক। আপনি যদি গোলাপ ভালোবাসেন তাহলে আপনাকে যেতে হবে এই পার্কে। তামিলনাড়ু হর্টিকালচ্যার ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত এই পার্কটি পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত।
এখানে আপনি সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রজাতির গোলাপ দেখতে পাবেন। এমনকি এখানে কালো ও সবুজ রঙেরও গোলাপ দেখতে পাবেন। গোলাপের এই রাজ্যে সর্বত্রই মনোরম সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি।
দেদাবেত্তা শৃঙ্গ :
এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ চূড়া দেদাবেত্তা শৃঙ্গ হতে চারপাশের দৃশ্য। ছবি : উইকিপিডিয়া
উটি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শৃঙ্গ এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ কেন্দ্রবিন্দু। খুব উঁচু জায়গা থেকে যারা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে পছন্দ করেন তাদের জন্য দেদাবেত্তা শৃঙ্গ দারুণ জায়গা।
এখান থেকে পুরো উটি শহরের চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে। এখানে 'টেলিস্কোপ ঘর' স্থাপন করা হয়েছে। যেখান থেকে আপনি নীলগিরির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
উটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের দুই কোটি বছর বয়সী জীবাশ্ম বৃক্ষ। ছবি : উইকিপিডিয়া
গার্ডেনটি প্রকৃতির এক মনোরম আবাস। প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বাগান নানা ফুলের গাছ, ফার্ন ও অর্কিডে পরিপূর্ণ। এখানে হাজার হাজার প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। এখানে দুই কোটি বছর বয়সী একটি জীবাশ্ম বৃক্ষ দেখতে পাবেন।
আরও আছে মাঙ্কি'স পাজেল ট্রি। নাম মাঙ্কিস ট্রি হলেও এই গাছে বানর চড়তে পারে না। এই বোটানিক্যাল গার্ডেনে শান্ত মধুর পরিবেশে বৃক্ষরাজির মনোরম শোভা মুগ্ধ করে পর্যটকদের। এখানে প্রত্যেক বছর মে মাসে ফুলের প্রদর্শনী হয় যা ‘গ্রীষ্ম উৎসব’ নামে পরিচিত।
উটি লেক :
ইউক্যালিপটাস গাছ ঘেরা উটি লেক। ছবি : ট্রান্স ইন্ডিয়া ট্রাভেল ডট কম
উটি থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে এই কৃত্রিম লেকটি অবস্থিত। এই লেকটি ইউক্যালিপটাস গাছ দিয়ে ঘেরা। মনোরম এই লেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করে। চমৎকার এই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এখানে নৌকার ব্যবস্থা আছে।
বিকেলটা এখানে নৌকা ভ্রমণ করে কাটিয়ে দিতে পারবেন। এই লেকের কিনারা বরাবর একটি হরিণ উদ্যান (ডিয়্যার পার্ক) আছে। এই পার্কটি ভারতের সেরা কয়েকটি চিড়িয়াখানার মধ্যে অন্যতম।
ওয়্যাক্স ওয়ার্ল্ড এ সাজানো বিখ্যাত ব্যক্তিদের মোমের মূর্তি। ছবি : উটি কটেজ ডট কম
বিভিন্ন মোমের মূর্তি দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে ওয়্যাক্স ওয়ার্ল্ডে। বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক কর্মী ও রাজনীতিবিদদের মোমের মূর্তি এখানে দেখতে পাবেন ।
ট্রাইবাল মিউজিয়াম :
স্থানীয় আদিবাসীদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবেন ট্রাইবাল মিউজিয়াম থেকে। ছবি : ট্রিপ এডভাইজর ডট কম
উটি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে এই মিউজিয়াম অবস্থিত। এটি উপজাতীয় গবেষণা কেন্দ্রের একটি অংশ। যারা এই অঞ্চলের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা এখানে যেতে পারেন।
এখানে তামিলনাড়ু এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদিম উপজাতীয় দলের বিরল হস্তনির্মিত সামগ্রী ও ছবি প্রদর্শিত হয়।
এই মিউজিয়ামের প্রধান আকর্ষণ হল পানিয়া, টোডা ও কোটার তিনটি জীবনাকৃতির যুগল মূর্তি। এছাড়াও আছে পানিয়া, টোডা, কোটা, কুরুম্বা ও কাণিকরন উপজাতিদের বসতবাড়ি। এখানে একটি দ্রুতগামী বাষ্পচালিত ইঞ্জিন রয়েছে যা পর্যটকদের নজর কাড়ে।