ইয়াং ইয়াং-এর পাতা থেকে, সাউথ সিকিম

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পাহাড় আর প্রকৃতির নান্দনিকতায় মাখা ইয়াং ইয়াং



ইয়াং ইয়াং, সাউথ সিকিম

ইয়াং ইয়াং, সাউথ সিকিম। ছবি : ট্রিপসারাউন্ড ডট ইন


ট্যুরের ক্ষেত্রে পরিচিত জায়গাগুলো জনপ্রিয় হওয়ায় আমি সাধারণত অফবিট লোকেশনগুলোই বেশি পছন্দ করি। এসব জায়গাগুলো একটু কম জন অধ্যুষিত এবং তুলনামূলক কম পরিচিত। অফবিট লোকেশনের সবচেয়ে বড় সুবিধা এসব জায়গাগুলো একেবারেই প্রকৃতির কোল ঘেঁষে অবস্থান করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের অবস্থান হয়ে থাকে দুর্গম এলাকায় যেখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধাও কম এবং থাকার জন্য নির্ভর করতে হয় স্থানীয় হোমস্টেগুলোতে।

ইয়াং ইয়াং

সেরকমই একটা অফবিট লোকেশনে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার বেশ কিছুদিন আগে। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দূরে সাউথ সিকিমে অবস্থিত ইয়াং ইয়াং। সিকিমের ভারতের অধীনস্থ হলেও ইয়াং ইয়াং এর বেশিরভাগ মানুষ নেপালি এবং এদের নিজস্ব সরকারব্যবস্থাও রয়েছে। তুলনামূলক ছোট আয়তন এবং স্থানীয়দের কথা চিন্তা করে সিকিম কর্তৃপক্ষ অন্য এলাকার ভাড়া করা গাড়ির উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

সিকিমে প্রবেশের ক্ষেত্রে পারমিশন নিতে হয় এবং এর জন্য দরকার বৈধ ভারতীয় ভিসা এবং ছবি। এই পারমিশন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ানো যায় সিকিম। যথাসময়ে পারমিশন নিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম ইয়াং ইয়াং-এর উদ্দেশ্যে। বর্ষাকাল হওয়াতে পাহাড়ের কোলঘেঁষে নেমে আসা ঝরনারা স্বাগত জানাচ্ছিল একটু পর পরেই। রাস্তার একপাশে ঝরনার কলকল শব্দে নেমে আসা স্রোত এবং অন্যপাশে গভীর খাত। নিচে স্বয়ং তিস্তা বহমান। মুহূর্তের অসাবধানতা ঠেলে দিতে পারে তিস্তার গভীর জলে। এ যেন ভয়ংকর সুন্দর!

ঘনঘন পাহাড়ের পথ

পাহাড়ের ওপরে গাড়ি পার্ক করে প্রায় ২০০ গজ হাঁটাপথ ধরে নামতে হবে পাহাড়ের নিচে। ঘনঘন পাহাড়ের আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এই মেঘ এই রোদ লুকোচুরির ফলে এই ২০০ গজ ছিল প্রচণ্ড পিচ্ছিল। সেই পথ পাড়ি দিয়ে একসময় পৌঁছলাম নিচে। নিচে পৌঁছে দেখলাম এক চিলতে সমতলে বানানো দুইটা কুটীর। সামনে গাঢ় সবুজ কার্পেটের মত দূর্বাঘাস। পেছনে সেই বহমান তিস্তার শোঁ শোঁ শব্দ। পাহাড়ের উৎপন্ন ঝরনার পানি মিশে যাচ্ছে তিস্তায়। অপার্থিব সুন্দরের হাতছানি।

থাকার জন্য বেছে নিলাম হোমস্টে

দু-পাশের পাহাড়ি গ্রাম ছেড়ে সামনে এগুতে এগুতে একসময় পৌঁছলাম গন্তব্যে। আমাদের থাকার জায়গা হয়েছিল ধুনী হোমস্টেতে। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ নেপালি এবং হিন্দি বা নেপালি ছাড়া আর কোনো ভাষা এরা একবিন্দুও বোঝে না। সেখানেই ব্যতিক্রম এই হোমস্টের ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা। বেশ ভালো ইংরেজি বুঝে, আলাপ পরিচয় চালিয়ে যেতে পারদর্শীই বলা যায়।


ইয়াং ইয়াং, সাউথ সিকিম

ইয়াং ইয়াং, সাউথ সিকিম। ছবি : দিগন্ত ট্রাভেল


 হোমস্টের স্বত্বাধিকারী ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা খুবই অতিথিপরায়ণ এবং অমায়িক। ভাবনা নামের এই মেয়েটির কল্যাণে আমি আশেপাশের নেপালিদের সাথে পরিচিত হই। এদের স্থানীয় জনপ্রিয় খাবার টোম্বা এবং এই টোম্বার দ্বারা এরা অতিথি আপ্যায়ন করে থাকে। নেপালি বিখ্যাত চা এবং মমো দুটোরই স্বাদ নেয়া হয়েছিল সেখানে। সবাই মিলে রাত জেগে মমো বানিয়ে আমরা অপেক্ষা করেছিলাম জোনাকি পোকার জন্য। এখানকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অর্গানিক খাবার। ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবেও কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে সিকিমে। ধুনী হোমস্টেতে দৈনিক খরচ হতে পারে ১,০০০-১,২০০ রূপি যার মধ্যে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত।

আরও যা দেখা যায় :

নামচি, রাবাংলা, ছালামথাং, সামাটার, টেমি টি গার্ডেন, সালুক ইত্যাদি।

ভ্রমণের সময় :

সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মে মাস পর্যন্ত সিকিম ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এর বাইরে হয় বরফে পথ ঢাকা থাকে নতুবা প্রচণ্ড বর্ষায় পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধের আশঙ্কা দেখা যায়। যেকোনো সময়েই ভ্রমণ করা হোকনা কেন পাহাড়ি এলাকা বলে এখানে শীতের প্রকোপ বেশি থাকে অন্যান্য জায়গার তুলনায়।

যেভাবে যাবেন :

সিকিম ন্যাশনালাইজড ট্রান্সপোর্টের বাস চলাচল করে শিলিগুড়ি থেকে সিকিম রুটে। চেকপোস্টে নেমে ভিসার পারমিশন নিয়ে লোকাল ট্যাক্সি ধরে যাওয়া যাবে যেকোনো গন্তব্যে। এছাড়া শেয়ারে গাড়িও আপনাকে পৌঁছে দেবে রাংপো চেকপোস্ট অবধি।

আরও যা দরকার হতে পারে :

সিকিমের যে কোনও জায়গায় ঘোরার জন্য গাড়ি, হোটেল, হোমস্টে কিংবা প্যাকেজ বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: নারায়ণ প্রধান; ফোন: ৮৪৩৬৬৪৯০০১, ৮৩৪৮৮১৩৮৪৫ সিকিম সফর সংক্রান্ত যে কোনও তথ্যের ব্যাপারে যোগাযোগ করতে পারেন: এমকে প্রধান (জয়েন্ট ডিরেক্টর, সিকিম ট্যুরিজম, গ্যাংটক), ফোন: ৮১১৬১০৭০৭১, ৯৮৩২০৬৫৬১৭

যা মনে রাখবেন :

সিকিমে যেখানে সেখানে থুথু এবং যাবতীয় ময়লা আবর্জনা ফেলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়াও ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সমস্যা হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।  

জোহরা মহসীন   এস এম